৫প-৫য়ঙ্গী
জরীপ অতর্তি
বিশববান্ী কাশবন ॥ কজিকাভা-৭
প্রথম প্রকাশ 2
১ল। ৫€বশাখ ১৩৫
প্রকাশক হ
ব্রআজকিশোন্ মণ্ডল
বিশ্ববাণী প্রকাশনী
১১৬, বানাণসী ঘোষ স্ত্রী
কিকাত1-৭
মুত্ধক 2
স্কুমান ভাঙাকী
শামকুষ্ প্রেস
৬» শিবু বিশ্বাস লেন
ক'লিকা তা-৬
প্রচ্ছদ শিল্পী £
হ্বোধ দাসগুগ্র
কায 2
সাড়ে চাল টাকা
«প্রেত-প্রেয়সী” আলফ্রেড হিচককের অসাধারণ
ছায়াছবি “ভার্টিগো' অবলম্বনে রচিত।
এ উপন্তাসের প্রতি ছন্রে আতীব্র উৎকণ।
আর শ্বাসরোধী রোমাঞ্চ 5 কারণ এ কাহিনী
এক অনিন্দ্য স্ম্দরী মোহিনীর যার স্বৃত্যু হয়েছিল
পত্র পর তিনবার !
মুখবন্ধ
*তপ্রত-প্রেয়সী” একটি ফরাসী বে মাঞ্চ-কাছিনীর
কাঠামোক্ম রচিত | সে কাহিনীর নাম “ভায়াবলিক”।
ইংরেজী ভাষায় একই কাহিনী “দি লিভিং আগ দি
ডেড, নামে প্রকাশ পায় । রূপালী পর্দায় গিয়ে
আঁলফ্রেভ হিচককের হাতে কাহিনীটি নতুন না
নেয়--ভার্টিগেো” ।
*৫প্রত-প্পেকসসী” কয়েক বছর আগে “মাসিক
রোমাঞ্চ)'তে প্রকাশিত হয়েছিল ।
অভ্রীশ বর্ধন
অগ্রজগ্রতিম বরেণ্য সাহিত্যিক
শ্রীমনোজ বসু
্রদ্ধাম্পদেযু-_
নিরীক্ষামূলক
রহস্তকাছিনীর প্রতি
ধিনি বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার
পরচয় দিয়েছেন
| এক ॥
তুর্লত, আমার স্ত্রীকে কিছুদিন চোখে চোখে রাখতে পাববে ?
হঠাৎ গন্ভীব গলার শুধোলে মহেন্দ্র
“কেন বলে হো, পাখা গজিয়েছে নাকি ? চোখ নাচিয়ে পাশ্ট।
প্রশ্ন করলাম আমি।
বুঝলাম না ।'
“মানে, এদিক ওদিক ওড়বাব সখ হয়েছে বুঝি ?'
য। ভাবছো, তা নয় ।'
“তবে কি?
বুঝিমে বলা শক্ত'*তকি বকন যেন হয়ে গেছে কস্তুবী |"
কি মুপকিল, শি বন্ধন হয়েছে, ত! তে। বলবে 2?
ত৭9 দ্বিধ। ক্নতে লাগল মহেন্দ্র । চোখ দেখে অনুমান কবলাম,
পাচ্ছে ঠাট্টা কবি, এই ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করছে না বন্ধুবর |
অথচ পনেবো বছণ আছগেকাব কলেজ সহপাঠী মহেন্দ্বের সঙ্গে
আজকেব মহেন্দেব বিশেষ কোনে। তফাৎ নেই। ওপরে ওপরে খুব
মিশুকে হলেও ভেনবটা ছিল একেবাবে অন্য ধাতু দিয়ে গড়া।
আন্মকেন্দিক আব লাভুক। একম।ত্র আমিই চিনেছিলাম ওকে।
সেই কাবণেই দীর্ঘ পনেবো বছস পরে আমকে পেয়ে ওর উল্লাস
দেখে মোটেই অবাক হই নি।
এইভাবেই চিরকাল উচ্ছসিত হয়ে উঠেছে মহেন্দ্র । কিন্তু
কোথায় যেন একটা খোচ থেকে গেছে ওব আজকের উচ্ছাসে |
অন্তত, আমার তো! তাই মনে হল। মনে হল, যেন বেশ
কয়েকবার মহড়। দেওয়ার পর স্টেজে নেমেছে মহেন্দ্র। ক্লাইমাক্সে
৪
প্রেত 'প্রেষসী--১
পৌছে যেন একটু অতি-অভিনয় করে ফেলেছে। তাই ছটফট
করছে, আঙুল মটকাচ্ছে অস্থির হাতে, হাসছে অস্বাভাবিক জোরে ।
কিছুতেই যেন সহজ হয়ে উঠতে পারছে ন1। তুড়ি মেরে উড়িয়ে
দিতে চাইছে মাঝের পনেরোটা বছর-_কিস্ত পারছে কই?
কালের ছোয়া লেগেছে মহেক্দ্রের চেহারায় | মাথাজোড়। টাকের
মরুভূমিতে লজ্জায় মুষড়ে পড়তে চাইছে কয়েকগাছি চুল। মাংসল
ভারি থুৎনিতে সে ধার আর নেই। ধোয়াটে ভুরু | নাকের পাশে
অনেক অভিজ্ঞতার ক্ষীণ রেখা ।
আর আমি? শুধু রোগাই হই নি। সেই বিপদটার পর থেকে
একটু ঝুঁকে চলাটাও অভ্যাসে এসে গেছে। অস্বস্তি লাগছিল
আরও একটা কথা মনে পড়ায়। আইন পড়েছিলাম স্রেফ পুলিসী
কাজের জন্যে । অথচ কেন যে স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিশ শুরু করেছি,
এই প্রশ্বই যদি ফস করে জিজ্ঞেস করে বসে মহেন্দ্র, তাহলেই
গেছি। ্
আমার কথার তক্ষুনি কোনো জবাব ন। দিয়ে স্ুরৃশ্ত সিগার
কেসটা এগিয়ে ধরলে মহেন্দ্র । বৈভবের ছাপ শুধু সিগার কেসে
নয়, রয়েছে ওর মূল্যবান সুট আর আঙুলের একাধিক আংটির
মধ্যেও।
গাল তুবড়ে আস্তে আস্তে মেজাজি ধোঁয়া ছেড়ে বললে,
“মুশকিল কিছু নয়, তবে এ হচ্ছে আাটমন্ষিয়ারের প্রশ্ন ॥'
নাঃ, অনেক পাল্টে গেছে মহেত্ৰ্র । ক্ষমতা আর এশ্বর্ষে মোডা
এ-চেহারার দিকে কিছুক্ষণ তাকালেই মনে হয়-এ সেই মানুষ,
বোর্ড অফ ডাইরেক্টরস্ মিটিংয়ে যাকে প্রধান আসন অলঙ্কৃত করতে
হয়, উঁচু মহলের রাঘব-বোয়ালের সাথে যার দহরম মহরম অনেকের
ঈর্ধার বস্তু, যার কৃপার ওপর নির্ভর করছে বহুশত পরিবারের অন্ন |
কিন্তু তবুও, আজ তার দৃষ্টি অস্থির, হাত চঞ্চল ।
কণ্ঠে একবিন্ু প্লে ঢেলে শুধোলাম, “আ্যাটমাক্য়ার £
রা
হ্যা, আটমক্ষিয়াব। আপাতত এব চাইতে লাগসই শব্দ
মাথায় আসছে না। না, না, সত্যিই আমাব ওয়াইফ খুব সুখী ।
চাব বছব হল বিয়ে হযেছে আমাদেব. সুখে স্চ্ছন্দে থকতে গেলে
বায! থাক। দবকাব, তাৰ কোনোটাবই অভাব নেই। নিমতা
গ্রামেব নাম শুনেছে ?
না তো |;
'বাখেব দেবত। দক্ষিণ বাষেব নান তো গুনেছে। %
“তা ওনেছি।,
“তাবই নহিমা নিষে “বাধ মঙ্গল" কাব্য লিখে যিনি যশস্ষী হযেছেন,
নিমভা গ্রাম সেই কবিকুঞ্চ দসেব জন্মস্থান | কিন্তু আজকেব দিনে
নিনতাঁৰ নামডাক আমাব ফ্যাক্টবাব জন্যে | স্ুতবা. মামা
মতাবট1 কোথায বলো?”
ঠা নানু?
“নেই। সেজন্যে কোনো ছুখও নেই । শুধু এইটুকু বাদ দ্রিলে
নেষেব। মা পেলে স্থ্থা হয, তাঁব সবই পেযেছে কস্তবী। তা সন্বেও
বেশ বুঝছি কোথায যেন একটা! ধক থেকে গ্রেছে।,
“খুব গোনড। স্বভাবের মেষে বুঝি ?
“মোটেই না। কখনও খুশিতে ভগমগ, আবাব পবের মুহুর্তেই
হয়তো মুখ কালো কবে বনে বইলো ঘণ্টাৰ পব ঘণ্টা । এক কথায়
মেজাঁজি। গত ক'মাসে আবও যাচ্ছেতাই হয়ে উঠেছে এই
মেজাজ |,
“াত্বশব দেখিযেছে। ?
“একবাব নয়, অনেকবাব | কিন্ত সবাঁবই এক বায়।'
ণকি ??
“কিছুই হয নি কস্তবীব |,
“কিছু না হওয়াটা শুধু দেহেব, না মনেব ?'
“ুয়েরই | বেয়াড়া কোনে লক্ষণ ধবা। পড়ে নি | অন্তত.
৯১
বলতে বলতে অস্থির হাতে মটমট করে আঙুল মটকালে!
মহেন্্র। অকারণে কোটের ওপর থেকে চুরুটের ছাই ঝাঁড়লো
কিছুক্ষণ ।
. তারপর বলল, "ডাক্তার যাই বলুক না কেন, আমি জানি কিছু
একটা হয়েছে ওর । প্রথম প্রথম আমিও ভেবেছিলাম, শৈশবের
কোনো বিভীষিকা থেকে এখনও হয়তো মুক্ত হতে পারে নি ওর
নরম মন--তাই কোনো ভয় মৌরসী পাটু। গেড়েছে নিজ্ৰ্ধান মনে।
লক্ষ্য করেছি, কথা বলতে বলতে আচমকা! বোবা হয়ে গেছে কন্তুরী ।
এমনভাবে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, যেন নিজের মধ্যে আর নিজে নেই।
সত্যিই অদ্ভুত। একনাগাড়ে বকবক করেছি কাঁনের পাশে, একবর্ণও
শোনে নি | কখনো কখনো সাধারণ এক-একটা জিনিসের দিকে
ঘণ্টার পর ঘণ্ট। বড় বড় চোখ মেলে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন
বিশ্বদর্শন করছে। একটা কথা বলি, তেসো না। এক-একবার মনে
হয়েছে, এমন কিছু ও দেখতে পাচ্ছে, যা আমার চোখে অদুশ্ঠ 1.
অনেকক্ষণ পরে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে হতভম্ব চোঁখে তাকায় আশপাশে
**যেন স্বামী, সংসারকে চিনি-চিনি করেও চিনতে পারছে না **
সিগাঁরটা নিতে গেছল | ফস কবে কাঠি জ্বালিঞে আবার
একমুখ ধোঁয়া ছাড়লো মহেন্দ্র । নীল-নীল ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে
শুন্য দৃষ্টি মেলে তাঁকিয়ে রইলো আমার পানে । এ দৃষ্টি আমি
চিনি। শক্ত অঙ্ক নিম়ে মাথা! ঘামাঁতে বমে ঠিক এমনি ভাবেই
সামনের বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকতো মহেন্দ্র ।
বললাম, শরীর আর মন, ছুই যদি সুস্থ থাকে, তাহলে, কির
মনে করে! ন1 মহেন্দ্র, যা শুনলাম তা ন্যাকাঁমো ছাড়া আর কিছু
নয়। মেয়েদের ছলাকলার তো অভাব নেই, নিশ্চয় কোনো
মতলব-_
সিগর সমেত হাত তুলে মাঝপথেই আমাকে থামিয়ে দ্রিলে
মহেন্দ্র ।
০২
বললে, “তা-ও ভেবেছি আমি। বেশ কিছুদিন চোখেও
রেখেছিলাম । একদিন ও মোটেব হাঁকিয়ে গেল কলক।তার বাইরে'*"
ঘোষপাড়ায়'**
'ঘোধপাড়া আবার কোথায় ?
“কাচড়াপাড়া থেকে মাহল পাঁচেক দৰে )
“তারপর ?
“ঘোষপাড়ায় হিমসাগর ন।মে একটা দীঘি আছে। দীঘিব
পাড়ে হাটুব ওপর থুৎনি বেখে জনেব দিকে তাকিয়ে অবিকল
প।খবেব ঘৃতিব মত বসে বইল বস্তবী।"
'দীঘিব পাড়ে বসে থাঁকাট1 কি অগ্তায় ?
“অন্যায় নয়, তবে স্বাভাবিক ও নয়। বলে বোঝাতে পারবো ন।
তূর্ভা৬ | দীঘিব পাড়ে আঘাটায় পসভে না বসতেই যেন পলকেব
মণ্যে সম।ধছু হয়ে গেছল ও। ভোলবাঁব নয় সেই অসাধাবণ গাম্তীধ
আক্ক ৬খরতা- হঠাৎ যেন ত্রহ্গাণ্ডে মমস্ত গুর্কহ ভেসে উঠেছিল
পদ্মপাতায় ঢাকা দীঘিব জলে * ঘাটে মেস্বো এসেছে, জল নিয়েছে,
গা ধুয়েছে, কাপড় কেচেছে, কিন্তু ধ্যান ভাঙে নি কস্তবীর | ওব তন্ময়
ঘৃঠিতে এমন কিছু ধবা পড়েছে যা আমাব চোখ এডিয়ে গেছে ।,
বাবিশ !?
“স।মিও ভেবেছিলাম বাবিশ | কিন্ত প্রবাদটা তো ভাই
গুলতে পাবছি না।?
প্রবাদ? এব মধ্যে মানাব প্রবাদ এল কোন্েকে
একতাল নীলচে পে রা হাড়লো মহেন্দ্র। সং সঙ্গে কোনো
জবান দিলে না। কিলখিলে ধোঁয়াৰ জটেব মধ্যে যুখটাও গলে
গলে মিশে ঘাঁওয়।ব যাওয়াব উপক্রম হলো ।
“কি হলো? চুপচাপ কেন? শুধোই আমি।
“বিশ্বাম করবে না, তাই বলতে ভবস। পাচ্ছি না।'
'কববো, করবো, করবো । শোনাও তোমাব প্রবাদ কাহিনী |,
১৩
থেমে থেমে বলল, “প্রবাদ, লোকে বলে হিমসাগরের জলে এক
আশ্চর্য শক্তি আছে | এ জল চোখে দিয়ে একবার একজন অন্ধ
দৃষ্টিলাভ করেছিল 1,
“তাতে তোমার কি ?
কস্তরীও কি.."মানে, তৃতীয় নয়ন বলে একটা কথা আছে
তো. ৬৫৪
“বুঝি না,কি করে এসব উদ্ভট কল্পনা তোমার মত শিক্ষিত
লোকের ম'থায় আসে । বিরক্তি আর চাপতে পারি না আমি,
“ওসব বাজে কথা ছেড়ে বলে। দিকি তারপর কি হলো %
“সেই দিন রাতেই কন্তুরীকে জিড্েস করলাম হিমসাগর দীঘিতে
কেন গেছিল সে। জবাব শুনে বুঝলাম অবস্থা আরও গোলমেলে |
সেদিন নাকি বাড়ির বাইরেই বেরোয় নি কস্তরী | মুগ দেখে
কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলাম না যে কথাটা! মিথো 1,
নাঃ সেই মহেন্দ্রই বটে | মনের পর্থায় কেঁপে কেপে মিলিয়ে
যেতে গিয়েও আবার ম্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল পুরোন বন্দর ছবি ।
গল্পটাও জমেছে বেশ |
মুখে বললাম, “আমার মনে হয়, স্ষ্টির শুরু থেকে যে খেলা
খেলে এসেছে কুহকিনী মেয়েরা, তোমার প্রীও তার আদ পেয়েছে ।
অর্থাৎ রঙ্গমঞ্চে আরও একজন পুরুষ রয়েছে |,
তর্ভনির টোকা দিয়ে লম্বা চোঙার মত সাদা ছাইটাকে ছাইদানিগর
গহ্বরে নিক্ষেপ করে মান হেসে বলল মহেন্দ্র, “আমি যা-যা ভেনে-
ছিলাম, তুমি তার কোনটিই বাদ দিচ্ছ না। কিন্তু আমি বিশ্বাস
করি না, কস্থুরীর পক্ষে এরকম নোংরা কাঁজ সম্ভব | তাঁছাঢা,
স্রেফ মজা করার জন্তে নিশ্চয় কেউ কলকাতার বাইরে গিয়ে
সেকেলে দীঘির পাড়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলের দিকে তাকিয়ে
থাকে না|,
স্ত্রীর সঙ্গে এ সম্পর্কে কোনে কথ! হয় নি?
১৪
হয়েছিল | জিজ্ঞেস করেছিলাম, হঠাঁৎ দ্বপ্াবিষ্ট হয়ে যাওয়াব
সময়ে ঠিক কি ধরনের অনুভূতি মনে আসে )
“কি বললেন উনি ?
«এ নিয়ে নাকি মিছিমিদছ্বি মাথা ঘামানোর কোনো দরকার
নেই । স্বপ্ন নয় মাঝে মাঝে এটা-সেটা তাবে |,
“তোমার ধারণা! কি?
“অনেকদিন আগে কলেন্গ পালিয়ে একটা ইটালিয়ান ছবি
দেখেছিলাম, মনে আছে তোমাৰ ?
“কি ছবি বলো তে ?
“নামটা মনে নেই । প্রেততন্র নিয়ে তোলা ছধি | মিডিয়ম
মেয়েটির ওপব প্রেতাম্মবি ভব হলেই গব গব কবে অনেক কথা
বলতো। কিন্ত পরে আর কিছুই মনে থাকছে। না। কস্তবীব মুখ
দেখেসেই হ)।শিয়ন আকট্রেসেব মুখটি মনে পড়ে গেছিল আমাব।
অবিচল সেই রকম ভাব ফুটে উঠতে দেখেছি কস্ত্রবীব মুখে৪।
ফাঁলফেলে চাউনি- মনেকটা নেশায় বুদ মাতানের মত 1?
“আমার তো মনে হচ্ছে, নেশাট। হুমিই কবেছো। | এবার কি
ভূতে পাওয়ার গল্প শুক হবে?
“জানতাম, এই কথ।ই ব্নবে ভূমি । মনেব সঙ্গে আমিও কম
লড়িনি। কিন্তু_-'
পুদোআচাব অভ্যেস আছে তোমার স্বীর ?
“মাছে ;ঃ তবে তেমন বাছাবাডি কিছু নয় |,
হাত দেখানোঁব বাতিক
“কম্মিন্কীলেও নেই | দুর্লভ, ঘা ভাবছো, তা নয়। অতীক্দ্রিয
অতি-শনুভূতি নিয়ে পিটার হাবকোম জমজমাট আয্মজীবনী
লিখতে পারেন- কিন্তু এ ব্যাপার সেরকম কিছু নয় | মাঝে মাঝে
কি যে হয়, হঠাৎ যেন পটটাই পাণ্টে যায় চোখের সামনে
পরিবর্তনট! ইচ্ছায়, কি অনিচ্ছায় তা;
১৫
লক্ষ্য করেছি। ইচ্ছার কোনে হাঁতই নেই বেচারীর । অনেক-
দিন ধরে এ-জিনিস দেখেছি বলেই এতটা! জোরের সঙ্গে বলতে
পারছি । স্বপ্নের ঘোরটা যখন আসতে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে কম্তুরী তা
টের পায়'-'দুরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করে--'অন্ত কোনো কাজ বা
কথা নিয়ে মনট। ভরিয়ে রাখতে চায়” কখনো কখনো জানলার
সামনে গিয়ে ফ্াঁড়ায়, জানল! খুলে দিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নেয়" "ঠিক
সেই সময়টিতে যদি ওর পাশে গিয়ে ঈাড়াই, তাহলেই যেন হাতে
বর্গ পায় ব্গেরী। বুঝতে পারি, ঝোৌঁকট। কাটিয়ে উঠতে চাইছে
ও | শেষ পর্স্ত পারেও। কিন্তুযদি হচ্ছে করে ওর দিকে মন না
দিই, তাহলে আর সামলাতে পারে না! নিজেকে 1
“তারপর |:
“বেসামাল হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চে।খ-মুখের চেহাবাঁও পাণ্টে
যার়। সমস্ত শরীর শক্ত করে একদষ্টে এমন কিছু দেখতে থাকে,
যা স্থির নয়, যা ক্রমাগত সরে সবে যাচ্ছে একদিক থকে
আব একদিকে" সেই সঙ্গে ওর চোখেও ঘুরভে থাঁকে ঘবের এদিক
থেকে ওদিকে । বেশ কিছুক্ষণ পরে বুক-ভ1$1 দীর্ঘশ্বান ফেলে
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘ।ম মুছে নেয় । তাঁরপব পাঁচ
মিনিট থেকে দশ মিনিট পর্যন্ত যেন ছ্ুঃন্বপ্নের ঘোরে চল।ফেব।
করে।,
অর্থাৎ ঘুমিয়ে হাটা ?
ঘুমের ঘোরে হাটতে আমি কাউকে দেখি নি***কীজেই.-তবে
কস্তুরীকে দেখে মনে হয় না যে ঘুমিয়ে আছে। মনে হয় যেন
কম্তরীর মধ্যে আর কস্তবী নেই'*'আর কেউ এসে ওর হাত প'
নাড়াচ্ছে, ওরই চোখ দিয়ে দেখছে । - ভাবলেও হাঁসি পায়-"-কিন্ত"-
ঠিক-..সেই মুহুর্তে কন্তুরী যেন আর একজন হয়ে যায়--.আর
একজন মানুয---কস্তরী নয় !
সত্যি সত্যি উৎকণ্ঠা মেঘ ঘনিয়ে ওঠে মহেন্দ্রের চোখে ।
১৬
একটু ধমকের স্ুরেই এবার বলি, “আর একজন মানুষ ! লোকে
বুজরুক ঠাউরাবে যে!
'জানতাম। তুমি যে বিশ্বাস করবে না, তা জানতাম । কিন্তু
এমন অনেক জিনিস, মানে, কতকপ্চলো অলৌকিক প্রভাব আছে
যা 535
কথাটা শেষ করতে পারল না মহেন্দ্র । ছাইদানির কিনারায়
সিগারটা নামিয়ে রেখে অস্থিরভাবে এমন জোরে আগুল দিয়ে
আঙুল জড়িয়ে ধরলে যে গঁট গুলোন্ছদ্ধ রক্তশুন্য হয়ে গেল।
বলি-বলি করে ও এতক্ষণ যা মুখে মানতে পারছিল না৷ মহেন্দ্র,
এবার আর ত! বাধা মানলো নাঁ, “ুর্ণভ, গুরু যখন করেছি, তখন
সব খুলেই বলি। কস্তুরীর পুর্ণপুববদেব মধ্যে উম। দেবী নামে
একজন রহস্তময়ী মহিলা ছিলেন | তেরো-চোদ বছর বয়স থেকেই
ইনি শুন্তের সঙ্গে কথা বলতেন, গরগর করে অতীত-ভবিব্ৎ বলে
যেঙেন, এমন কি শুধু ভাত ঝুসিঘে নাকি অনেকের পুরোন ব্যারামাও
সারিয়ে দিতেন।
কোন্ সালের কথা বলছে %
“ষোড়শ শতাব্দীর | সালটা মনে নেই। উমা দেবীর এই
আশ্চষ ক্ষমতার কথা মুখে খে ছড়িয়ে পড়ে । অনেক সাধু
সন্নাসীও আসতেন তার কছে। মেয়ের মভিগতি দেখে বাড়ির
লোকেরা তো মহাচিন্তায় পড়লেন। শেষকালে উমা দেবীও
সন্ন্যবাসিনী না হয়ে যান। উনি নিজেও সে ইচ্ছা একাশ করেছিলেন
_-তার কারণও ছিল। আ্রিকালগ্রষ্টী হিসেবে গুর অদুত ক্ষমতার
গল্প ডালপাল। মেলে ছড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের
কাছে দেবীর মত শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন উনি । এদিকে বিয়ের বাজারে
নাজেহাল হয়ে যাচ্ছিলেন অভিভাবকেরা । শেষ পর্বস্ত পাই হাল
ছেড়ে দেওয়ার পর অপ্রত্যাশিততাবে ঈমা দেবীকে জীবন-সঙ্গিনী-
রূপে গ্রহণ করলেন কর্তাভজ। সম্প্রদায়ের এক গৃহী-সন্নযাসী 1 বিয়ের
১৭
পর একটা বাচ্চাও হয়েছিল। তারপরেই কি এক অজ্ঞাত কারণে
আত্মহতা। করেন উমা দেবী |,
এসব কাহিনী আমার ভালই লাগে। মহেন্দ্র থামতেই
শুধোলাম, কর্তীভজ। সম্প্রদায়টা আবার কি হে?
“'আউলঠাদ নামে এক সাধু এই সম্প্রদায়ের প্রবর্তক।
শ্রীচৈতন্যদেব পুবীধামে অন্তর্ধান করার বহুকাঁল পরে নাকি আবার
আউলচাদরূপে আত্মপ্রকীশি করে, “গুক সত্য” এই মহামন্থ প্রচার
করেন। খএ-সন্বন্ধে ভারি ইণ্টাবেস্টিং একটা কিংবদন্তী আছে।
তোমার ধৈর্য থাকলে শোনাতে পা্ি।,
নড়ে চড়ে বসে বললাম, শোনাও ।
কিস্তরীর এই সব উপসর্গ এখা-যাওয়ার পর থেকেই এ-সম্বন্ে
আমি অনেক খোঁজখবর নিয়ে এত কথা জেনেছি । জনশ্রুতি সে,
উল অর্থাৎ বীবনগব নিবাসী মহাদেব নামে জনৈক বাক্জীবি ১৬৯২
খুষ্টাব্দের কান্তন মাসেব প্রথন শুক্রবাব ভাব পাঁনেব বরজেবঙ্মবে;
এক অন্ঞাতকুলশীল শুদর্শন বালককে দেখতে পান | মহাদেব তাকে
ঘবে এনে ছেলের মতই মানুষ কবেন- নাম, রাখেন পর্ণচন্দ |
মহাদেবের যবে পুর্চন্দ্র হবিহর ন।মে জনৈক ন্ষাবেবকাছে সংস্ঘহ ভাব!
শিক্ষা আর ধর্মশান্্র অধায়ন করেন | বিশ বছব বয়েসে শান্তিপবেধ
কাছে ফুলিয়ায় গিয়ে বলরাম দাসের কাছে বৈষ্বধর্মে দীক্ষিত হন ।
তখন থেকেই তার নাম হয় আটলটটাদ। কর্তাভজাঁদেবকে বৈষ্ব
সম্প্রদায়ের একটা শাখা বলতে পার | নিজের ধর্মকে এবা সত্যধর্ম
বা সহজ ধর্ম বলে থাকেন। এঁদের মতে কর্তী বা ঈশ্বর জগতের
আর্টা | আর, গুরুই ঈশ্ববেব প্রতিনিবি | গুকদেনকে বলা হয় “মহাশয়
শিষ্যদের “বরাতি” | সম্প্র্ানেব সাধন বিষয়ে কতকগুলে। গুট-রহস্থ্য
আছে, য। সম্প্রদায়ভুক্ত বাক্তি ছাঁড়া আর কেউ জানতে পারে না।
“লোকে বলে, আউলর্াদের বাইশ জন শিষ্ত ছিল। তাদের
মধ্যে রামশরণ পাল আউলটাদের মৃত্যুর পর গুরুর পদ পান।
১৮
এখনও তার বংশধরেরাই ঘোষপাড়ায় থেকে এই সম্প্রদায় পরিচালন!
করেন। রামশরণের স্ত্রী খুব ধর্মপরায়ণ ছিলেন । শিষ্যরা তাকে
'সতীমা; বলে ডাকতো । একবার নাকি কঠিন অস্থথে মারা গিয়ে-
ছিলেন তিনি । তখন আউলটটাদ কাছের একট পুকুর থেকে খানিকটা
মাঁটি নিয়ে তার গায়ে মাখিয়ে দিতেই তিনি বেঁচে উঠেছিলেন ।'
তন্ময় হয়ে শুনছিলাম । মহেন্দ্র থামতেই শুধোলাম, “রিয়ালি
ইন্টারেস্টিং । কিন্ত এর সঙ্গে উমা দেবীর কি সম্পর্ক? আর, উম
দেবীর সঙ্গেই বা তোমার স্ত্রীর সন্দেহজনক গতিবিধির কি জন্বন্ধ ?
“সম্পর্ক আছে ভাই, না থাকলে কি এত কথা বলি তোমাকে?
ঘোষপাড়া ডালিমতলায় “সতীমা'র সমাধিস্থান আজও একটা
দেখবার মত জায়গা | রামশরণেরই এক শিত্যকে বিয়ে করেছিলেন
উমা দেবী । আত্মহত্যার পর তাকেও সমাধিস্থ করা হয়েছে এই
ঘোবপাড়াফ ঠিমসাগর দীঘির পাড়ে-ঘে দীঘির মাটি মাখিয়ে
“নতীর্সা'কে বাচিয়ে তুলেছিলেন আউলটাদ ।;
বন্দুকের বুলটের মই শেবের কথা লো! গেঁথে গেলো মনের
মধ্যে । কোন কথাই বলতে পারলাম না আনি ।
ফিশ্ফিস্করে মহেন্দ্র বললে, “ছুর্লভ, পঁচিশ বহর বয়সে আনুহত্যা।
করেছিলেন উম। দেবী | একটু থেমে, “কস্তুরীর বয়স এখন পচিশ
বছর !'
হঠাৎ ঘরের ঘডডিটাও বুঝি থমকে দাঁড়িয়ে যায়| থমথমে হয়ে
ওঠে ঘরের ধাতাস। ছুজনেই নিশ্চুপ | মনে মনে সমস্ত কাহিনীটা
সাঁজিয়ে নিয়ে শুধোলাম, “তোমায় জী নিশ্চয় জাঁনেন-"-মানে,
উম! দেবীর কাহিনী নিশ্চয় তার অজানা নয় ?"
না, ও জানে না। এ ইতিহাস আমি শুনি শাশুভীর সুখে |
বিষের পরেই উনি বলেছিলেন । তখন অবশ্য কোনে গুরুত্ব দ্রিউ
নি এসব কথায়'*-না শুনলে মনে কষ্ট পাবেন, তাই মন দিযে সবই
শুনেছিলাম." 'শাশুড়ী মারা গেছেন অনেকদিন |"
১৪
চি
একট প্রশ্ন । শাশুড়ীর অন্ত কোনো মতলব ছিল কিন।
জানো?
“কথায় কথায় হঠাৎ এ প্রসঙ্গ উঠেছিল | তবে উনি বারবার
হুশিয়ার করে দিয়েছিলেন আমায়__এ ইতিহাস আমি যেন
কোনোদিন কন্তররীকে না শোনাই | মেয়েকে তিনি চিনেছিলেন
হাড়ে হাঁড়ে--মনের সুস্থতা সন্বন্ধেও বোধহয় সন্দেহ একটু
ছিল ।
“কিন্ত খ্বার এত হাঁড়ির খবর রাখা হয়েছে, তার আত্মজত্যার
কারণ অজান। রইল, এটা কেমনতরো কথা ।'
কারণ নাকি কেউ খুঁজে পায় নি। বাইরে থেকে যতদুৰ মনে
হয়, খুবই সুখে ছিলেন চিনি । ছেলের মা হয়েছিলেন মাত্র মাস
কয়েক আগে । তারপবেই আচমকা একদিন-*
“সবাই বুঝলান | কিন্ত তোমার স্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারের সম্প্কট।
যে কোথায়, তা তো মাথায় আসছে না।'
দীর্ঘশ্বাস ফেললো মহেন্দ্র । বলল, “সম্পর্কট। এখুনি পরিক্ষার
করে দিচ্ছি । মায়ের যৃডার পর উত্তরাখিকাব কুত্রে বন্ধ অলঙ্কার
পেয়েছিল কস্তবী। পুক্বানুক্রমে পাওয়া এই সব অড়োয় গয়না
মধ্যে আছে একট! পদ্মরাগ মণির নেকলেস ।
পদ্মরাগ মণির নেকলেস %
হ্যা, খুবই মূল্যবান জিনিস | তার চেরেও বেশি এর পারিবারিক
গুরুত্ব | নেকলেসটি উন? দেবীর | কি কারণে এক জমিদার গুহিণী
কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ উপহার দিয়েছিলেন ভাকে | নেকলেসের
প্রতিটি পন্মনাগ মণির মধ্যে কস্তুবী কি দেখেছে জানি না, দিন নেই,
রাত নেই, একদৃষ্টে মণিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে ও । উমা দেবীর
₹ও আছে বাড়িতে | ঘণ্টার পর ঘণ্টায়
ওর কাণ্ড দেখে । আয়নার
পাশেই ছবিট! খাড়া করে রেখে পদ্মরাগ নেকলেস গলায় ঝুলিয়ে
উম! দেবীর মতই বিশেষ কায়দায় খোঁপা বাঁধছিল-"-,
কুয়াশা! ঘনিয়ে ওঠে মহেন্দ্রের উদ্বেগ-আকা চোখে । থেমে
থেমে শেষ করে ও, “তারপর থেকেই ওই একই কায়দায় খোপা
বেধে আসছে কস্তবী। পিঠের ওপর নয়, এ খোঁপ। ঝুলতে থাকে
বাদিকের কাধের ওপর ।,
উম দেবার সঙ্গে ওর চেহাবার কোনো মিল আহে?
'মিল---তা একটু আছে--..খুটিয়ে দেখলে ধবা যায়| খুবই
অস্পষ্ট ।'
“তাহলে আর একট প্রশ্ন করি £হ তোমার অ।সল ভয়ট। কিসের ।
তা বলবে কি?
পিগারটা তুলে নিয়ে অন্ধকাব-মুখে ছাই-জমী ডগার দিকে
তাকিসে প্হল মহেগ্্র |
বলল, “স্পষ্ট কবে বলা মুশকি ন--- তবুও বলব, একটা জিনি।
খুবই পর্িফ্ষাৰ হয়ে গেছে । ছূর্ণভ, কন্থুধী আর আগেব মত নেই".
আর-- তাব, মাঝে মাঝে কেবলই মনে হয়
কি %
“যে মেয়েটির সঙ্গে ঘর করছি, সে কগ্তবা নয় |?
সশবে চেয়ার ঠেলে উঠে দাড়ানাম,*বীবে,বন্থ ধারে ! যদি স্রী-ই
নাহন, তবে কে উনি? উমা দেবী? মাই ডিয়ার মহেন্দ্র, একটু
বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ন। ?--ডিঙ্ক করো নিশ্চয় ট কি খাবে ? হইস্ষি ?
রম ? জিন ? না, না, যা ভাবছে, তা নয় | গাঁড় মাতান আমি নই
তবে মাঝে মাঝে সুবাম্বাদ গ্রহণ কর।কে দোষেব মনে করি না।'
“জিন উইথ লাইম |”
পাশের ঘরে কাবার্ডের সামনে দাড়িয়েছি, পেছন থেকে শুধোলে।
মহেস্ত, “নিজের গাওন! গাইতে গিয়ে তোঁমার খবরই জিজ্েস করা
হয়শি। বিয়েসাদি করেছে। ?
ই
$
$
৫
না।
কেন ?
প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে শুধোলাম, গভর্মমেন্টের ওয়ার কনট্রাক্ট
ধরেছে নিশ্চয় £
হ্যা। ইস্পাতের ।
ছুটে গেলাস ভরে নিয়ে বললাম, “যুদ্ধ, যুদ্ধ আর যুদ্ধ! কান
ঝালাপাল। হয়ে গেল যুদ্ধের পাঁয়তার! শুনতে শুনতে । ওদিকে তো!
স্বভাষ বোস উঠে পড়ে লেগেছেন আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়তে-*.
হিয়ার ইজ লাক, মহেন্দ্র 1
“অল দি বেস্ট, ছুর্লভ |;
গেলাস তুলে ছজনে তাকালাম হুজনের চোখের পানে । মাথায়
একটু খাটো৷ হলেও গায়েগতরে দিবিব ভারি হয়েছে মহেন্দ্র।
হবেই বা না কেন, টাকায় গড়াগড়ি দিলে চামচিকেও হাতী হতে
পারে। এই যুদ্ধেই কোটিপতি হয়ে যাবে মহেন্দ্র--'কিন্ত আমার
মনে ঈর্ষা কেন?
গেলাসট। নামিয়ে রাখলাম টেবিলের ওপর |
শুধোলাম, “এমনও তো। হতে পারে যে কোনো নিকট আত্মীয়ের
হাতে সম্পত্তি যাওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন তোমার স্ত্রী £
দূর সম্পর্কের কয়েকজন ভাই-টাই আছে বটে, কিন্ত তাদের
সঙ্গেই দেখ। সাক্ষাৎ হয় না আমাদের 1
“তোমাদের বিয়েটা হলে। কি ভাবে ?
“আকসিডেন্টালি, খুবই রোমন্টিকভাবে।'
“কিরকম
“কারবার স্বত্রে বোশ্বাই গিয়েছিলাম । আলাপ হয়েছিল
হোটেলে ।;
«কোন হোটেলে ?
“সী-ভিউ।,
২২
“বোন্বাইতে উনি গিয়েছিলেন কেন ?
“ছবি আকা শিখতে | ইগ্ডাস্ীয়াল আর্ট ।
চাকরির মতলব ছিল বুঝি ?
না,না। বড়লোকের মেয়ের অনেক খেয়াল থাকে, এও তাই
আঠারে। বছর বয়সে নিজের নামে যে গাড়ি কেনে, তার কি চাকরি
দরকার হয়? আমার শ্বশুর তো নামকরা ইগ্তাস্ীয়ালিস্ট |;
কথা বলতে বলতে গেলা স হাতে পায়চারি করছিল মহেন্দ্র । প
ফেলা আর কথা বলার মধ্যে ফুটে উঠছে গভীর আত্মবিশ্বাস যা তার
কোনোদিনই ছিল না| ছাত্রজীবনে আড়ষ্ট চলাফেরা! আব মাঝে
মাঝে তোতলামোর জন্য কতই না টিটকিরি সহা কবতে হয়েছে।
আজ আর সে-সবের চিহ্ঃমাত্র নেই | সত্যিই, বিয়ে করে কপাল
ফিরিয়ে ফেলেছে মহেন্দ্র।
জিজ্ঞেস কবি, 'ঝগড়া-টগড়া কিছু হয়েছিল? অথবা কোনে
খারাপ খবর ? মেয়েদের মন তো খুব নবম, হয়তো"
'না। অনেক ভেবেছি, সেবকম কিছুই পাইনি । তবে
“তবেকি?
হপ্টার বেশির ভাগ দিনই তো নিমতায় থাকতে হয় আমাকে ।
কাজেই
“আচ্ছা, বাড়ির বাইরে থাকো। বলেই কি এই সব লক্ষণ ?
“আমার তা মনে হয় না। প্রথম আযাটাকের পরেই তা বুঝে-
হিলাম। সেদিন ছিল শনিবার | বাড়ি ফিবে দিবিব হাসি খুশি মেজাজে
দেখলাম কপ্রীকে | কিস্তুরাতের দিকে মেজাজ দেখে খটকা লাগলো ।,
তার আগে?
“মাঝে মাঝে একটু “মুডি'থাকতো। বটে-_তবে তা আর পাচজনেৰ
মতই- বাড়াবাড়ি কিছু নয়।'
“কিন্ত সেই শনিবারে খটক। লাগলো নিশ্চয় অস্বাতাবিক কিছু
লক্ষ্য করেছিলে বলে ?
ষ্২৩
'ঠিক সেরকম কিছু না! হলেও স্বাতাবিক মনে হয় নি ওকে |:
“তুমি থাকো কোথায় ?
,অবাক হয়ে তাকাল মহেন্দ্র | তারপর হেসে ফেলল।
ভুলেই গেছিলাম যে, দেড় যুগ পরে দেখা হল আম।দের | নিউ-
লিপুরে বাড়ি করেছি। এই নাও কার্ড। কিন্তু তুমি বিয়ে
রছে! না কেন দুর্লভ ? হীরামন পাখি না পেলে বিয়ে করবো ন৷
|ইপের কোনে পণ-টন নেই তো
কান না দিয়ে জিজ্ছেস করলাম, “সেই শনিবারে বাড়ি আসার
1র কি-কি হয়েছিল, সব বলো ।
বাড়ি ফিরেছিলাম সকাল দশটায়। খেয়ে দেয়ে টেনে ঘুম
দিলাম। দুপুর তিনটে নাগাদ বেরোলাম ছুজনে | সেক্রেট!বিয়েটে
আমার একটু দরকার ছিল; সেখান থেকে গেলাম চৌরঙ্গী |
ফিরপো'তে কিছুক্ষণ বসার পর *'এক কথায়, এমন একট। নিগ্রি
বিকেল বিয়ে না কর পধন্ত যার স্বাদ তুমি বুঝবে না ।”
“অসঙগতিটা লক্ষ্য করলে কখন ?
“রাত্রে খাবার পর
তারিখটা মনে আছে ?
“সেকি হে! তাই কি কারো থাকে ?
তবুও ক্যালেগারের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল মহেন্দ্র,
“মাসটা। যে ফেব্রুয়ারি, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই | তারিখটা ছিল
মাসের শেঘের দিকে-**এই তো শনিবার"-ছাবিবশ তারিখ ।
মহেন্দ্রের সামনে এসে চোখে চেখি রেখে শুধোলাম।? এত লোক
থাকতে আমার কাছে আসার কারণ কি?
আবার হাত কচলাতে শুরু করল মহেন্্র। সেই পুরোন
বদ্ত্যাস। সব গেছে__এটাই শুধু যায় নি।
বিড়বিড় করে বলল মহেন্দ্র, ছাত্রজীবনে তুমি ছিলে আমার
ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাছাড়া, আমি তো৷ জানি, সাইকোলজি তোমার
২৪
বিশেষ সাবজেক্ট । আর, এ-ব্যাপার নিয়ে পুলিসের কাছে কি
যাওয়া যায় ?,
আমি ভুরু কুচকোতেই তাড়াতাড়ি শেষ করলে মহেন্দ্র, পুলিসের
কাজ তুমি ছেড়ে দিয়েছো শুনেই ছুটে এলাম তোমার কাছে।'
সোঁকার পিঠে টোকা মারতে মারতে বললাম, “সত্যিই ছেড়ে
দিয়েছি-*-কিস্ত কেন জানো ?
'না।,
আজ হোক, কাল হোক, জানতে পারবে । এসব কথা তে।
ধামাচাপা থাকে না।'
একটু হাসতে পারলে বাঁচতাম । মনের ওপর জোর যে কতখানি,
ত| দেখানোর জণ্ঠেই এখন একটু ফিকে হাসির দরকার ছিল।
কিগ্ত পারলাম কই? শেষের ওই ক'টি শব্দের মধ্যেই তো বেজে
উঠলে' তিক্ত সুর ।
কললাম, “এক বাট! জালিরাতের সঙ্গে'-"একটু জিন দ্রিই %
না। থাঙ্ক ইউ |,
বস্তা-পচ। গল্প । আমি ছিলাম ডিটেকটিত।| ডিগ্রী থাকুক
আর না থাকুক, পুলিসের খাতায় নাম লেখালে হেন কাজ নেই যা৷
করতে হয় না। কোনোদিনই ভাল লাগে নি কাজটা। বাবা
উন্নতি করেছিলেন এ-লাইনে-কাজেই আমাঁকেও ঘাড় মুচড়ে ঢুকিয়ে
দিয়েছিলেন। যাক গেসে কথা *"বাগবাজারের এক জালিয়াতকে
আারেন্ট করার তার পড়েছিল আমাদের ছজনের ওপর | অনেক
কষ্টে হদিস বার করলাম আমি আর ইসমাইল । পুলিম বাড়ি ঘেরাও
করেছিল | সে ব্যাটা ওপর তলার ঢালু টালির ছাদের একদম শেবে
একটা খুঁটি আকড়ে বসেছিল'*'এমন জায়গায় বসেছিল যে":
ইসমাইল ছেলেটিও বড় ভাল ছিল-*"ওরকম ছেলে***
এক চুমুকে গেলাসটা শেৰ করে নামিয়ে রাখলাম | ঝাপসা হয়ে
এল দৃষ্টি। খুকখুক করে কেশে নিয়ে শুরু করলাম আবার, “দেখলে
২৫
প্রেত-প্রেয়সী--২ |
তো? যতবারই বলি এই গল্প, ততবারই এই রকম হয়। মনে হয়
যেন, পা-পিছলে পড়ে যাচ্ছি আমি-*"ঢালু টালির ছাদের একদম
কিনারায় খুঁটি আঁকড়ে বলির পাঠার মত কাপছিল সে। অনেক
নিচে বড় রাস্তায় গাড়ি-ঘোঁড়া চলার আওয়াজ পাচ্ছিলাম । কাজট।
এমন কিছু কঠিন নয়। তাছাড়া! খুব বিপঙ্জনকও ছিল না লোকটা ।
কাজেই, একটু সাহস করে এগিয়ে গিয়ে কলার ধরে টেনে আনলেই
ল্যাটা চুকে যেত। কিন্তু আমি ত৷ পারলাম না-..কিছুতেই পারলাম
না।'
“মনে পড়েছে” বললে মহেন্দ্র, “ছোটবেলা থেকেই খুব উঁচুতে
উঠলে মাথ। ঘুরতো। তোমার-__নিচের দিকে তাকাতেই পারতে না।'
'আমাব ওই অবস্থা দেখে ইসমাইলই এগিয়ে গেল। হঠাৎ
একটু পা পিছলে যেতেই আর সামলাতে পারলে না...আছড়ে
পড়ল বড় রাস্তায় ।;
“ইস্
কার্পেটের ওপর চোখ নামিয়ে বসে রইল মহেন্দ্র । মুখ দেখে
বুঝলাম না, ওর মনের ভাবটা কি।
আমি-_;
“এরকম অবস্থায় নার্ভ ফেল করা স্বাভাবিক |, মুখ তুলে বললে
মহেন্দ্র ৃ
কিছুক্ষণ সব চুপ।
তারপর, “কিন্ত বন্ধুর পা! পিছলে যাওয়ার জন্তে তো তুমি দায়ী
হতে পারো না।
প্যাকেট খুলে একট] সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বললাম, ধরো 1:
প্রত্যেকবারই এইরকম না-উপলন্দি-করা অবিশ্বাসের সামনে
পড়তে হয়েছে আমাঁকে,কেউ গুরুত্ব নিয়ে শোনে নি । কিন্তু কি করে
শোনাই সেই ভয়ঙ্কর চিংকার ? শুন্যের মধ্যে দিয়ে ওলোটি-পালোট
খেয়ে সবেগে নেমে চলেছে ইসমাইলের দেহ-.বুকফাটা অস্তিম-
২৬
চিৎকারে ফাল। ফাল! হয়ে যাচ্ছে আকাশ বাতাস..'ভ্রমশ ক্ষীণ হয়ে
এসেছে রক্ত-হিম-কর! সেই বিকট আর্তধ্বনি''"তারপরেই পাঁষাণের
বুকে অস্থি-মাংস-মেদ-মজ্জ1! আছড়ে পড়ার প্রচণ্ড শব্দ ।-* "হয়তো,
হয়তো মহেন্দ্রের স্ত্রীও এই ধরনের কুরে কুরে খাওয়া কোনে
বিভীষিকা নিয়ে ভূগছেন-..উনিও কি স্বপ্নে সেই রকম রক্ত-জমানো
চিৎকার শুনে ধড়-মড়িয়ে উঠে বসেন?
তাহলে তোমার হেল্প পাচ্ছি? শুধোয় মহেন্দ্র।
“ক করতে হবে আমাকে ?
বউয়ের ওপর একটু নজর রাখতে হবে। তার চাইতেও বড়
কথা, এ-সম্পর্কে তোমার কি অভিমত, তা শুনতে চাই 1,
“কিন্ত আমাকে দিয়ে কোন সাহাযা কি হবে?
“সে চিন্তা আমার'-.আজ রাতে কোনে আযপযেপ্টমেন্ট
আত £
'আছে। কেন?
“ভেবেছিলাম, রাত্রে খাবার নেমন্তন্ন কববো । যাক, আর একদিন
হতে |?
না, না, আমি চাই না আমাকে চিনে ফেলেন উনি, তাতে
মস্থবিধে হবে কাজের ।'
“কিন্ত ওকে তুমি চিনবে কি করে?
সিনেমায় নিয়ে যাও ।,
“মতলব ভালোই । কাল আমরা নিউ-এম্প্যায়ারে যাচ্ছি।
বন্সে। ইভিনিং শো11
ঠিক আছে। আমিও যাবো ।,
“দুর্লত, দু-হাতে আমার হাত জড়িয়ে ধরে বললে মহেন্দ্র “তুমি
যে,কি উপকার করতে চলেছে! আমার) তা৷ ভাষায় কোনোদিন
প্রকাশ করতে পারবে না।” ভারপর পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে,
“তোমাকে অফেণ্ড করতে চাই না, কিন্ত সম্মান-দক্ষিণ নিয়ে
২৭
এখনও কোনো কথা হয় নি। অবশ্য তুমি যা করবে, তার
তুলনায়
“এখন থাকুক” বলি আমি, কেন জানি মনে হচ্ছে, তোমার স্ত্রীর
সঙ্গে আমার কোথাও একটা মিল রয়েছে । তাই জল-ঘুলিয়ে আমি
দেখতে চাই, কি লুকোতে চাইছেন উনি ।,
“কিছুই লুকোচ্ছে না।,
“দেখ! যাক ।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল মহেন্দ্র। নামতে নামতে পেছন
ফিরে হাসি-মুখে বিদীয় অভিবাদন জানালে তুবার | ঘরে ফিরে
এলাম আমি। জানলার পাল্লা খুলে দিয়ে নিচে তাকাতেই চোখে
পড়ল গাড়িটা । মস্ত গাড়ি। কুচকুচে কালো! রঙ । কি গাড়ি?
জাগুয়ার? প্রিমাউথ? উপর থেকে বোঝা মুশকিল । নিঃশব্দে
যেন তেলের ওপর দিয়ে পিছলে গিয়ে রাস্তার মোড়ে উধাও হয়ে
গেল বিশাল যন্্যান-*-কন্তবরী *'নামটা তারি মিষ্টি। খুব নরম
সঙ্গীতের মত "'হালকা ছন্দ লুকোনো আছে এ-নামে। কিন্তু
কাঠখোট্রা এই লোকটাকে দেখে এ-মেয়ে মজলো কি করে?
আশ্চর্য ? ভেতরটা যার একেবারেই ফৌপড়া-'না আছে পোৌকষ, না
আছে জ্ঞানচকমিকির ঝিকিমিকি-*"তাকে দেখে এমন সুন্দর নামের
মেয়েও প্রেমে পড়ে ? অন্য কারো সঙ্গে তলেতলে মন দেওয়া-নেওয়া
ছিল নিশ্চয়, তা নাহলে মাঝে মাঝে উন্মন! হয়ে যাওয়ার মানেটা।
কি?.*"ঠিক হয়েছে-*'এশবর্ষের ছটা তাঁর চলনে-বলনে.* "এমনি
শীল্তিই তার প্রাপ্য । লোক-দেখানো এত আত্মবিশ্বাসওয়ালা
লোকদের কি জানি কেন সহা করতে পারি না আমি." "হয়তো
আমার তা নেই বলেই |
খিচডে গেছিল মেজাজট1| দড়াম করে জানল বন্ধ করে ফিরে
এলাম ঘরে। টিন থেকে কয়েকটা বিস্কুট নিয়ে চিবুতে চিবুতে
আরও একটু জিন ঢেলে নিলাম গেলাসে। রেডিও চালিয়ে দিয়ে
ন্২টৈ
এসে বসলাম চেয়ারে । খবর বলার সময় হয়েছে-*'সেই একই
খবর, হিটলারের পদভরে মেদ্িনী কম্পিত। ঘর অন্ধকার করে
মাঝে মাঝে আরও একট খবর আমি শুনতাম *'আই-এন-এ রেডিও
থেকে প্রচারিত খবর."
কয়েক ফোটা বিটার ঢেলে দিয়ে চুমুক দিলাম গেলাসে।
পুলিশের কাজে ব্যর্থ হলেও চাকরির জন্যে দরজায় দরজায় ঘুরি নি
আমি । অথচ'**ড্রয়ার টেনে একট। লাল লেফাপা বার করে ডান
দিকের ওপরের কোণে ছোট করে লিখলাম, ডোসিয়ার, মহেন্দ্র
কৌশিক" |
২৯
॥ দুই ॥
ঘাড়টা একটু ঘোরালেই চোখে পড়ে মহেন্দ্রকে | বক্সের কিনারায়
ছু-হাঁত ভাজ করে বসেছিল ও | ঠিক পিছনেই কন্তুরী। ছিপ-
ছিপে একহারা চেহারা, হাতির দাতের মত ধবধবে মুখশ্রী। দৃব
থেকে চোখমুখ স্পষ্ট না দেখা গেলেও একটুকরে। মিষ্টি রূপ যে
সেখানে বসে খয়েছে, তা বুঝতে দেরি হয় না| একমাথা কালো
চুলের মাঝে ফুরফুরে পাতল। মুখটি মেখের বুকে বিছ্যাতের মতই
তীক্ষ, প্রদীপ্ত। আশ্চর্য, এমন গবিমা মাখানো আভিজাত্যে মোড়
রূপসী মেয়েকে বধূরূপে পেল কি করে মহেন্দ্র?
শুরু হলো ছবি, প্রাণ পেলে বপালি পর্দা--আমাব মন কিন্তু
নিমেষে অন্তহিত হলো সেই পুরোনো দিনগুলিতে । আমি আব
মহেন্দ্র ছুজনেই ছিলাম টাকার এপিঠ আর ওপিঠ। লাঞজুক আব
আড়ষ্ট । সহপাঠিনীরা ঠাট্টা! করতো, মুখ বুঁজে সহা করতাম ছুজনে।
কাছে সরে আসতে পেরেছিলাম বোধহয় সেই কারনেই !
আর আজ ?__আমি যা ছিলাম, তার চাইতেই খারাপ অবস্তায়
পৌছেছি। আর মহেন্দ্র"?
কিন্তু এত সাহম পেল কোথেকে ও? আর কন্তবী? হঠাৎ
সমবেদনায় মন ভরে ওঠে আমার | মনে হল, যেন একটা আশৃশ্থা
প্রাচীরের একদিকে রয়েছে মহেন্দ্। অপবদিকে আমি আব
কম্তরী ৷
আচ্ছা, সী ভিউ হোটেলে যদ্দি মহেন্দ্রের বদলে আমার সঙ্গেই
আলাপ হতো কস্তরীর? সারি সারি সুখময় কল্পনা ভেসে ওঠে
মনের পটে--"একসঙ্গে খাওয়া: বেড়ানো "হাত ধরাধরি কবে সিড়ি
দিয়ে ওঠা...
চোখ খুলে নড়েচড়ে বসলাম কুশন-আট। চেয়ারে । হল ছেড়ে
এখুনি বেরিয়ে পড়তে পারলে ভালো হতে | কিন্তু সে সাহসও আমার
নেই| এতগুলো লোককে বিরক্ত করে বেরোনোর চাইতে বরং-**
ঘাড় ফেরাতেও ভরস। পাচ্ছিলাম না । তাই চোখের কোণ দিয়ে
দেখি, একইভাবে ক্যানভাসে আক ছবির মত স্থির হয়ে বসে রয়েছে
কন্তরী। আলে চমকাচ্ছে কান আর গলার রত্বুখচিত আভরণে।
বুঝি চোখেও | মাথা কাৎ করে নিক্ষম্প দেহে বসেছিল যেন পাথরের
ভেনাস। ভারি খোপাটা রয়েছে একদিকে কাধের ওপর--পিঠের
ওপর নয়। বিাঁচত্র ফ্যাশন !
ঘড়টা বোধ করি একটু “বশিই ঘুরিয়ে ফেলেছিলাম । পাশের
ভদ্রলোক বিরক্ত মুখে তাকাতেই এতটুকু হয়ে গেলাম আমি | আর
না, এবার বেরোতে পারলেহ ঝাচি।
আচ্ছ॥ যে নেয়ে বিয়ে করে অসুখী, সে যদি স্থথের সন্ধানে অন্ধ
প্রণয়া 'খোজে তাতে দোষের কি? কন্তুরীর কাছেও হয়ত এটা
একটা ব্যমন। তাই যদি হয়, তাহলে--ভাবতেই মনটা খুশি খুশি
হয়ে ওঠে |
আগের মতই রোশনাই ছড়াচ্ছে কম্থুরীর রত্ুখচিত ইয়ার রিং।
যেন একটি অপরূপ সুন্দর ফোটো গ্রাক। অভাব শুধু এককোণে
একটি স্বাক্ষরের । মনের চোখে এবার সইটাকেও দেখতে পাই--
দর্ণত সামন্ত ।
নাঃ বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে | কিন্তু মনকে আন বাধি কি
করে? পেরেছি কি সেই ঢালু ছাদ, ভিজে টালি আর অনেক নিচে
যানবাহনের গুমগুম ধ্বনিকে ভুলতে ? অস্থির হয়ে ওঠে আঙ্ুলগুলো!
--অনেকটা মহেন্দ্রের মতই ।.**
মনের অলিন্দে আনাগোনা করল আরও কত লাগামছেড়া উদ্ভট
চিন্তা । তারপরেই দপ করে জ্বলে উঠলো আলো । ছবি শেব।
ভিডের মধ্যে ভাসতে ভাসতে এসে পৌছলাম দরজার কাছে।
৩০
সিঁড়িতে লোক জমে গেছে। বক্স থেকে বেরিয়ে এল সন্ত্রীক
মহেন্দ্র | কন্তুরীর একদম গা ঘেষে এগিয়ে গেলাম আমি | খুব
কাছ থেকে খু'টিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিলাম চোখ-মুখ-কান-নাক।
ব্যাক আউট রাত। যুদ্ধকালীন নিরাপত্তী। অন্ধকারের
ঘোমটা নামিয়ে ভয়ার্ত নগরী অপেক্ষা করছে শক্রুপক্ষের বিমান-
বহরের। মাথা নিচু করে হেঁটে চললাম আমি |
কন্তরী-_মুগনাভির মতই যার সৌরভ শত যোজন দূর থেকে
আকুল করে তোলে সৌন্দর্যপিয়াসীর হিয়াকে। যার ভ্রমরকৃষ্ণ
চাহনিতে মেখ-মল্লারের সব মিড়গুলো আর্ত হয়ে ওঠে পথহারা
সেই কন্তরী সত্যই কি মহেন্দ্রের স্থল সাহচধে সুখী হতে পেরেছে ?
এমন মেয়ের পেছনে ফেউয়ের মত না লেগে থেকে যদি পারতাম
হাঁতে হাত দিয়ে-_
কিন্তু একি! আবার সেই চিন্তা! শেষে কি বিশ্বাসহস্তার
মত বন্ধুত্ত্রীর প্রেমে ডুবতে হবে ! |
মন খারাপ হয়ে যায় বিরক্তি আর গ্রানিতে | দ্রত পা চালাই
ফ্ল্যাটের দিকে।
£ কালকেই মহেন্দ্রকে ফোনে জানিয়ে দিতে হবে, এ কাজ
আমার দ্বারা হবে না|, পনেরো৷ বছর যার সঙ্গে কোনে সম্পর্কই
ছিল না, তার কামুন্দি ঘাটতে গিয়ে খামোকা অশান্তি ডেকে
আনতে আমি চাই ন1।
ভালো ঘুম হলো ন! রাত্রে। সকালে উঠেই মনে পড়লো আজ
কন্তরীর পিছু নিতে লবে। সঙ্গে সঙ্গে হাক্কা হয়ে যায় মনটা | একি
বিপদ ! কিছুতেই কি রেহাই নেই এই উটকো! চিন্তার খপ্পর থেকে ?
জোর করে ঘুরিয়ে দিলাম রেডিওর নবটা। যুদ্ধের খবর। সার!
পৃথিবীতে বাজছে রণদামামা। টুথব্রাশ নিয়ে ঢুকে পড়লাম
বাথরুমে |
হুপুরেই হাজির হলাম মহেন্দ্রের প্রাসাদপ্রতিম বাড়ির সামনে ।
৩২
ব্যাফেলওয়ালের গা ঘেষে বেঞ্চি পেতে চাঁরসের দোকান খুলেছিল
এক উড়িয়ানন্দন। একটি ভাড়ের অগ্ডার দিয়ে চোখের সামনে
কাগজ মেলে বসে পড়লাম আমি ।
কিছুক্ষণ পরেই গাড়ি বারান্দায় এসে দাড়ালো কালো গাড়িট।।
মহেন্দ্র নেই। এবার আসবে কন্তরী |
কিন্ত সে যে আজকে আসবেই, তা আমি জানছি কি করে?
উত্তরে, মন বলে উঠলো, হ্যা, সে আসবে । আসবে শুধু আমার
জন্যেই । ধের আলোয় নীলার মত জ্বলন্ত ওই ঘাস পাতা মাড়িয়ে
আসবে সে আমারই সামনে ।
তারপরেই, আচমক। দেখলাম তাকে । মার্বেলের সি'ড়ির ওপর
মাবেল স্ন্দরীর মতই দাড়িয়ে আছে সে। মরকতমণির মত উজ্জ্বল
একট। শাড়ি একান্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে ঘিরে রয়েছে দেহবল্লরীকে ।
ইচ্ছে ইল, তুলির কয়েক টানে ধরে রাখি সেই অপবূপ মৃতি।
কিন্তু হায়রে, সেখানেও আমি অক্ষম | প্রথম যৌবনে নিছক
খেয়ালের বশে একেছিলাম কয়েকটি ছবি । বন্ধুরা তা দেখে যা
মন্তব্য করেছিল? তা জীবনে ভুলবার নয়।
ছোট ছোট পা ফেলে নেমে এলো কস্তরী। খুট করে দরজা
খুলে উঠে পড়লো স্টিয়ারিং হুইলের সামনে | গর্জে উঠলে এঞ্জিন |
অদূরে দাড় করানো আমার মরিস মাইনরে উঠে বসলাম
আমি। শুক হল পিছু নেওয়া ।
কালে। গাড়ির যেন কোনে। তাড়াই নেই। ধীরে সুস্থে এসে
পৌছলো ময়দানের পাশে, সেখান থেকে মিউজিয়ামের সামনে ।
নেমে দাঁড়াল কন্তরী । দরজ। বন্ধ করে হেলান দিয়ে তাকিয়ে
রইল প্রবেশ পথের দিকে । যেন দ্বিধায় পড়েছে সে, যাবো কি
যাবে। না। একবার এক-পা এগিয়ে আবার পিছিয়ে এল। বেশ
কিছু দূরে গাড়ি থামিয়ে সকৌতুকে দেখতে লাগলাম মরকতমূতির
দোনামোনা মনোভাব । তারপর মনস্থির করে ফেলল কন্তরী।
৩৩
আবার স্টিয়ারিং হুইলের সামনে বসে স্টার্ট দ্রিলে গাড়িতে । নিশ্চয়
মিউজিয়াম দেখার চাইতেও মুল্যবান কোনো আযাপয়েন্টমেণ্ট মনে
পড়েছে ।
অবাক হয়ে লক্ষা করলাম, আগের চাইতে দ্রুত ড্রাইভ করছে
কস্তরী। হঠাৎ যেন কিসের আকধণে বেগবান হয়ে উঠেছে ওর মন,
তাই আর তর সইছে না। সমান গতিতে পেছনে ছুটে চলল মরিস
মাইনর।
নগরীর সীম! ছাড়িয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল সামনের
কালে গাড়িখানা।
মিষ্টির দোকানের সাইনবোর্ড দেখেই জায়গাটার নাম জানলাম
ঘোষপাড়া।
মহেন্দ্রের মুখে শোনা কাহিনীট। মনে পড়ে গেল। শুধু কাহিনী
না বলে কিংবদন্তীই বলা উচিত। কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রবণ
আউলটাদের লীলাভূমি এই ঘোষপাড়া | যেখানকার হিমসাগর
দীঘির মাটি ছু'ইয়ে “পতীমা”কে আবার বাঁচিয়ে তুলেছিলেন তিনি,
সেই পুণ্যভূমিতেই প্রবেশ করেছে কস্তরীর প্রকাণ্ড কালো গাডি।
গাড়ি ছেড়ে দিয়ে হাটতে শুরু করেছিল কণ্তরী। অরক্ত রঙের
শ।ড়িখানা হাওয়ায় উড়ুছিল অল্প অল্প। কাধের ওপর বিচিত্র
কায়দায় হেলানেো কবরী থেকে কয়েকটি চুল খুলে এসে উড়ছিল
মুখের ছু-পাশে। অনন্যমনা হয়ে হাটছিল ও। সহজ গতিতে ওর
পথ চলার ধরন দেখে মনে হলো যেন রাস্তায় প্রতিটি ধুলিকণা,
প্রতিটি খোয়া আর গর্তের সঙ্গে ওর অনেকদিনের পরিচয় ।
গাছপালার ফাক দিয়ে হঠাৎ ঝিকমিক করে উঠল জলের ওপর
সুর্যের রোশনাই । এক নক্ষত্র শত নক্ষত্র হয়ে জ্বলছে হিমসাগরের
জলের আয়নায় | কন্তরী কিন্তু দীঘির পাড়ে গেল না। এগিয়ে
এল ঝোপঝাড় থেকে বিচ্ছিন্ন একটা কুঞ্জের দিকে ।
এককালে যা কুঞ্জ ছিল, আজ তা অযত্বে ঝোপেরই সামিল হয়ে
৩৪
উঠেছে । ফুলবনের সঙ্গে মিতালি পাতিয়েছে আগাছার জঙ্গল।
এরই মধ্যে একটা ক্ষীণ পায়ে চল! পথ ধরে অদৃশ্য হয়ে গেল
ক্তরী।
কখনও গাছের আড়ালে, কখনও ঝোপের আড়ালে থেকে
একবারও চোখের আড়াল করিনি সামনের মৃত্তিকে । ছুনিবার হয়ে
উঠেছিল কৌতুহল । শহরের মেরে শহর থেকে এত দূরে এসে এমন
সহজ ভঙ্গিতে ঝোপের মধ্যে যখন অন্তহিত হয়েছে, তখন আমার
অন্ুমানই ঠিক | প্রিয় মিলনেই এতদূর ছুটে এসেছে কন্তরী |
এ অবস্থায় দূরে দাড়িয়ে থাকাই উচিত। কিন্তু না, দেখে যেতে
হবে, শিজের চোখে দেখে যেতে হবে মাকড়শার মত কোন্ রহাস্তের
জাল বুনে চলেছে বন্ধুবরের রূপসী ভাধা ।
সম্তপপণে উকি দিলাম | ওই তো বসে রয়েছে কন্তরী । একা,
আর তো। কেট তই কুর্জের মধ্যে | চারধারে বৃন্তাকারের ফুলঝোপের
ঠিক কেন্দ্রে একটা জীর্ণ সমাধি। চুঁনবালির পলস্তারা খসে গিয়ে
অনেক জায়গার বেরিয়ে পড়ছে পাতল। পাতলা সেকেলে বাংলা
ইটের গাঁথনি। মানুয-প্রমাণ উচু এই প্রাীন সমাধির ভেতরে
একটা চ্যাট।লো পাথরের ওপর বড় বড় অক্ষরে তেল-গি তারে লেখা £
উন। দণী
ঘাসের ওপর হাটু মুড়ে মাথা নিচু করে স্থির হয়ে বসেছিল
কস্তরী। দৃষ্টি ঘাসের ওপর | নিষ্পাপ সেই দেহের মধ্যে প্রাণ
আছে বলে মনে হয় না|
অনেক." অনেকক্ষণ এইভাবে বসে রইল কস্তরী ৷ তারপর একটা
মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ তুলে তাকালে সামনের সমাধির পানে।
হাতের মুঠি খুলে ঝোপ থেকে তুলে জান! কয়েকটি ফুল সমাধির
প্রান্তে রেখে উঠে ধাড়াল।
সরে এলাম আমি । অতিভূতের মত পালিয়ে এসে গা-ঢাকা
দিলাম একটা জ্রামগাছের আড়ালে । মহেন্দ্রের মুখে শোনা
৩৫
রোমাঞ্চকর কাহিনীর পটভূমিকায় দেখা এই দৃশ্ট যেন সাময়িক-
তাবে আমার চিস্তাশক্তিকেও অবশ করে তুলেছিল। অদ্ভুত ওর
বসে থাকার তঙ্গিমা | এ যেন প্রিয়জনের সমাধির সামনে বসে থাকা!
নয়, দীর্ঘদিন দূরে থাকার পর স্বগৃহে ফিরে এসে আত্মবিভোর হয়ে
যাওয়া। সত্যই আশ্চধ কোনো রহস্ত লুকিয়ে আছে কস্তরীর স্থটি-
ছাড়া ধরন-ধারণের মধ্যে।
ওই তো1বেরিয়ে আসছে কস্তরী। হাতে একটা ফুল" 'রক্তগোলাপ
'-"পাঁতাসমেত ফুলটাকে গালের কাছে ধরে মাটির দিক চোখ নামিয়ে
পায়েপায়ে এগিয়ে চলেছে হিমসাগর দীঘির দিকে | অল্প-অল্প হাওয়ায়
চর্ণকুম্তল এলিয়ে পড়ছে কাশ্মীরি আপেলের মত কপোলে । যন্তরমানুষের
মতই দীঘির পাড়ে এসে দাড়াল কন্তরী। কিছুক্ষণ আপন-মনে
অত্যন্ত মন্থর চরণে পায়চারি করল".-পাড়-বরাবর এদিক থেকে
ওদিকে- আবার ওদিক থেকে এদ্রিকে। ভারপর নিশ্চল হয়ে
দাড়িয়ে রইল জলের দিকে তাকিয়ে । ঘড়ি দেখলান-াচ মিনিট ।
সমাধির সামনেও এমনিভাবে পুরো বারো মিনিট বসে ছিল সে।
হঠাৎ একটু ঝুঁকে পড়ল কন্তরী | ক্লান্তি,নাকারোর প্রতীক্ষায় থাকার
অসহিষ্ণুতা 1"*"রক্তগোলাপটাকে চোখের সামনে ধরলো "আবার
তাকাল জলের পানে * লক্ষ সুর্ধ জ্বলছে দীঘির জলে "ঠিকরে পড়!
আলে! ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলছে কন্তরীর হাতীর দাতের মত
ধবধবে সাদা মুখের ওপর.*-আটসাট পরিধেয়র মধ্যে দিয়ে উদ্ধত
হয়ে উঠেছে ওর যৌবনস্রী'""রামধন্থুর মত ঝলমল করছে মরকত
শাড়ি..'রক্তগোলাপের একটি একটি পাপড়ি ছিড়ে দীঘির জলে
তাসিয়ে দিচ্ছে কম্তরী। নিনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছলে ছলে
ওঠা পাপড়িগুলোর দিকে । ভাল করে দেখার জন্যে এগিয়ে গেলাম
**"হাত দশেক দূরেই উড়ছে কস্থরীর শাড়ির অঞ্চল | কিন্তু আশ্চর্য,
তবুও তন্ময়তা ভাঙলো! না ভাববিহ্বল সেই নারী-মৃত্ির। এবার
পাতাগুলিও উড়ে গিয়ে পড়ল হিমসাগরের জলে-*'খুব কাছে
৩৬
দাড়িয়েছিলাম--'তাই স্পষ্ট দেখতে পেলাম স্ুচারু অধরের প্রান্তে
কুয়াশা ঢাকা পঞ্চমীর চাঁদের মত ম্লান হাসিটুকু।
পিছিয়ে এলাম আমি | ফিরে আসছে কন্তুরী। একই রকম
অলস চলনতঙ্গি। তাড়াহুড়োর লেশমাত্র নেই | আশ্চর্য এই ভাবের
ধ্যান। এ-ধ্যানের রহস্ত আমাকে জানতে হবেই।
শ্যামবাজারের মোড়ে একটা রেস্তোরা থেকে ফোন করলাম
মহেন্দ্রকে |
হ্ালো ! মহেন্দ্র? দুর্লভ কথা বলটি--মিনিট খানেক সময় ব্যয়
করবে আমার জন্যে ?--না, না, আমিই যাচ্ছি তোমার অফিসে-*"
কয়েকটা কথা জিজ্জেন করতে চাই:*."ঠিক আছে, এই এলাম বলে 1
অফিস দেখে তাক লেগে গেল। একটা পেল্লায় বাড়ির পুরো
একতলায় উগ্র সাহেবী কায়দায় সাজানো অফিস | আয়নার মত
ঝকঝকে ফ্রাশ-ডোরের ওদিকে ততেোবিক চকচকে একটি প্রাণোচ্ছল
তরুণ বসেছিল । মহেন্ছের খোজ করতেই বলে উঠল, “আপনাকে
তো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে-উনি এখন কনফারেন্সে ।?
সুসজ্জিত ওয়েটিংরুমে পালকের মত নরম কুশনে গা এলিট
দিলাম | একটু পরে কাচের ভেতর দিয়ে দেখলাম, হোমরা-চোমনা
কয়েকজন পুৰষকে নিয়ে দরজ। পর্যন্ত এগিয়ে গেল মহের্দ্র।
ফিরে এল একটু পরেই | রিসেপনিস্ট-এর সাঁননে উচ্ছ্বাস ন'
দেখিয়ে গম্ভীর মুখে বললে, “এতক্ষণ বসিয়ে রাঁখার জন্যে দুঃখিত-__
বড ব্যস্ত ছিলাম আজ | এস, আমার কামরায় |?
নিখুঁতভাবে মাফিনি কায়দায় সাজানো মহেন্দ্র ঘর। ফাইলি,
ক্যাবিনেট, ইস্পাতের নলচে-চেয়ার, ক্রোমিয়াম পেডেস্ট্যালের ওপব
ছাইদানি আর ঘরের দেওয়ালে একট প্রকাণ্ড ভারতবষের ম্যাপ।
পাশে বোডের ওপর ব্যবস! বৃদ্ধির গ্রাফ।
“দেখা হল কন্তরীর সাথে ?
৩৭
“পিছু নিয়েছিলাম |,
“কি কি দেখলে £
“সমাধির সামনে গিয়ে বসেছিল |:
“ঘোষপাঁড়া ? যার কথা তোমায় বলেছি, তারই সমাধিতে **,
হ্যা।
দেখলে তো !-*"বলেছিলাম না! তোমাকে £?
অর্ধচচন্দ্রাকৃতি টেবিলের একপ্রান্তে ছৃপ্ধধবল টেলিফোনের ঠিক
প্রান্তেই রুপোর ফ্রেমে বাঁধানো কস্তরীব ছবিটার পানে তাকিয়ে
ছিলাম আমি | ছবির ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই শুধোলাম,
“সমাধির ওপর শুধু একটা নামই দেখলাম । পূর্বপুকষরা-+
তাদের সমাধি ওই অঞ্চলেই আছে, তবে অন্থত্র | কি রকম
মনে হল তোমার? ভাবগতিক দেখে অলৌকিক সন্দেহ হচ্ছে
নাকি? তাছাড়া ও জায়গায় যে ওব এই প্রথম যাওয়া নয়, তা
নিশ্চয় বুঝেছে ?
“রকম সকম দেখে তো৷ তাই মনে হল। কাউকে পথঘাটের
হদিস জিজ্ঞেস না করেই যেতে দেখলাম । অন্যমনস্ক ছিল আগা-
গোড়া, তবুও কোথায় যেতে হবে সে-সন্বন্ধে জ্ঞানটা টনটনে ছিল
বলেই মনে হল আমার 1,
“ঠিকই মনে হয়েছে তোমার | ওকে উম দেবীতে পেয়েছে
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে একটু পায়চারি করে নিল মহেন্দ্র ।
চধির দলা ঠেলে উঠল কড়া ইস্ত্রি-করা কলারের ওপর। হঠাৎ
টেলিফোন বেজে উঠতেই বিরক্ত হয়ে এক ঝটকায় রিসিভারটা
তুলে নিয়ে হাত দিয়ে মাথপিসট1 চাপা দিয়ে বললে, কস্তরীর
ধারণা ও নাকি উমা দেবী । কাজেই কেন আমার এত উদ্বেগ, তা
নিশ্চয় বুঝতে পারবে এবার |,
চাপা-গলা শোনা গেল ইয়ার ফোনে | চট করে মাউথপিসটা
মুখের কাছে তুলে বললে. মহেন্দ্র, হ্যালো-'ম্পিকিং'*"
৩৮
একদুষ্টে আমি তাকিয়ে রইলাম কন্তুরীর ছবির পানে । পাথরের
মৃত্তির মত মুখ, চোখের তারায় জীবনের রঙ আছে কি নেই, তা
বোঝা ভার। দমাস করে রিসিতার রেখে দিল মহেন্দ্র । হঠাৎ
মনটা খারাপ হয়ে গেল আমাঁর--না এলেই ভাল হতো । মনে হল,
কম্তরীর রহস্য শুধু কন্তরীকে ঘিরে থাকলেই ভাল ছিল । মহেন্দ্র
যেন আরও জলটা ঘুলিয়ে দিতে চাইছে । অদ্ভুত একটা আইডিয়।
মাথায় আসে । ধরা যাক, উমা দেবীর আত্মা
রাঁগত সুরে বলে মহেন্দ্র,মাথার ঘায়ে কুকুর পাগলের মত মরছি,
তার ওপর যন্তো ঝামেলা-
বিয়ের আগে তোমার স্ত্রীর পদবী কি ছিল?
“সেন। কস্তরী সেন। শ্বশুরমশাই কোটিপতি_এই সেদিন
মারা গেলেন | অনেকগুলো পেপার মিলের মালিক ছিলেন।
আদি বাবসা পন করেছিলেন ওর ঠাকুর্দী। উনি ঘোষপাড়া থেকেই
এসেডিলেন বোম্বাইতে ভাগ্যান্বেবণে |,
“কিন্ত তোমার স্্রী হোটেলে থাকতেন ?
টেবিলের ওপর ব্লটার দিয়ে টরেটক্া করতে করতে মহেন্দ্র বলল,
শখ হয়েছিল বলে'*আমার শাশুড়ি কিন্ত একদিন চীৎপুরে
পাথুরিয়ীঘাটার কাছে একট] পুরোনে। বাড়ি দেখিয়ে বলেছিলেন,
উম] দেবী নাকি এককালে এখানে থাকতেন. একতলায় একটা
কিউরিও শপ আছে"""যাকগে সে কথ, কস্তরীকে আজ দেখে তোমার
কি মনে হলো বলো ।'
হাত উল্টে দুর্লভ বলল, “বলার মত কিছু নেই ।
“কিন্ত ওর ধরনধারণ যে স্বাভাবিক নয়, তাতো মানে ?
“মনে হয়--আচ্ছা, ছবি আকা কি উনি একেবারেই ছেড়ে
দিয়েছেন ?
'একদম। স্ট,ডিয়োর যা ছিরি হয়েছে, পা ফেলা যায় না।'
“কেন?
৩৪৯
“কি কেন?
"ছবি আকা ছাড়লেন কেন ?
“কি করে তা বলি ?.*'অবশ্য ওর মাথ। আছে, ছবি আক ছাড়াও
আরও অনেক গুণ তগবান ওকে দিয়েছেন-*'তাছাড়। বিয়ের পর
মেয়েদের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে তো-_"
উঠে দাড়ালাম । বললাম, “আর নয়, অনেকটা সময় নষ্ট করলে
আমার জন্যে |;
না, না, সে কি কথা, অমনভাবে কথা বলো! না। কস্তরীর এই
অবস্থা,আর আমার সময়'**আচ্ছা, 11017765015 বলো তো কন্তুরীকে
উন্মাদ বলে মনে হয় কি?
“মোটেই তা নয়। খুব পড়াশুনার বাই আছে কি গর?
“না1। তুমি যেরকম বলছো, সেরকম নয়। মাঝে মাঝে সময়
কাটানোব জন্যে ছুচারটে হাক্ষা। পপুলাব ম্যাগজিন পড়ুয়া সব ঘবেই
পাওয়া যায়|;
“বিশেষ কোনে হবি ??
“তেমন কিছু মনে পড়ছে না।'
“ঠিক আছে। দেখি কি করতে পাবি ।'
“মনে হচ্ছে, তোমাব উৎসাহ কমে এসেছে ?
“কেন জানি না, বারবার মনে হচ্ছে মিছিমিছি সময় নষ্ট কবছি
আমি ।?
আসল কথাট! চেপে গেলাম | মনে মনে যে হপ্টার পর হণ
কন্তরীকে ধাওয়া করার সংকল্প গ্রহণ করেছি, তা আর মহেন্দ্রকে
জ[নানে। দরকার মনে করলাম না। এ রহস্তের কিনারা করা না
পর্যন্ত শান্তি পাবো না আমি, কিন্তু সেকথা বলে লাত কি?
মহেন্দ্র বলল, “এ ঝামেলায় তোমাকে টেনে আনার জন্যে আমি
কুন্ঠিত। কিন্তু দেখতেই পাচ্ছো, আমার অবস্থাটা । যাক, নতুন
খবরটবর পেলে টেলিফোন কোরো 1,
৪০
“করবো ।:
রাস্তায় বিকেল ছটায় ভিড শুরু হয়েছে। হন্তদন্ত হয়ে
কেরানীকুল ছুটেছে নিজের নিজের সুঈট হোমের দিকে । হোম
নেই শুধু আমার--*হয়তো একটা :আছে--*কিন্ত তাকে স্থুঈট বলা
চলে না কোনমতেই-"*কন্তুরী-*"কন্তুরী-*"কস্তুরী * একটা শরবতের
দোকানে বসে পড়ে লম্তির অর্ডার দিলাম***উমা দেবীর সমাধির
সামনে স্বপ্প দেখছে কন্তুরী-""বাড়ির জন্যে, মন কেমন করছে!
বাড়ির জন্যে না, ওই সমাধির জন্যে ! না, না, এসব কি অবাস্তব
কথ ভাবছি আমি । কিন্তু কোনটা অসম্ভব, আর কোনটা সম্ভব,
তা-ই বা সঠিক জানছে কে?
ফ্লাটে ফিরলাম অনেক রাতে! রগের ছুপাশে টিপটিপ করছে।
খাওয়ার পাট হোটেলেই চুকিয়ে এসেছিলাম | তাই জুতোস্ুদ্ধই
কিছুক্ষণ চিৎপাত হয়ে শুয়ে রইলাম বিছানায় । তারপর উঠে পড়ে
জামাকাপড় পালটে এ্যাসপিরিনের বড়ি গিলে নিভিয়ে দিলাম
আলোটা।
৪১
প্রেত-প্রেয়সী--৩
॥ তিন ॥
বর্ধমানের মহারাজার প্রাসাদ পেরিয়ে গেল কন্তরী। বেয়নেটধারী
ভোজপুরী দারোয়ান বারেক ফিরে তাকালো ওর সুঠাম দেহের
দিকে । কন্তরীর কিন্ত কোনে দিকে দৃষ্টি নেই। আজ কিন্তু
গাড়িতে নয়, হেটে । অস্বাভাবিক দ্রুত হাটছিল ও। যেন জরুরী
এনগেজমেন্ট রক্ষী করার জন্যেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সে। কিন্তু
এত তাড়াতাড়ি ও চলেছে কোথায়? আজকে একেবারেই অন্যতাবে
সেজেছে কন্তুরী | আটসাঁট যৌবনোদ্ধত পোশাকের বদলে সাদাসিদে
বাদামী রঙের একটা তাতের শাড়ি জড়িয়ে রয়েছে অঙ্গ | সাপের
মত বেণী এলিয়ে পড়েছে পিঠের ওপর ।
ট্যাক্সিস্ট্যাণ্ডে হঠাৎ দাড়িয়ে গেল কন্তরী। মাথা নীচু করে কি
ভাবলে । তিনটে ট্যাক্সি দাড়িয়েছিল সামনে | কোনো দ্বিধা ন।
করে উঠে পড়লে সামনের ট্যাক্সিটায়।
স্টার্ট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক পেছনের ট্যাঞক্সিটায় উঠে বসলাম
আমি।
চীৎপুরের একটা বাড়ির সামনে এসে দীড়ালে৷ 'সামনের
ট্যাক্সিটা। এই বাড়িটার কথাই মহেন্দ্র বলেছিল না? ওই তো!
একতলায় কিউরিও শপ রয়েছে । কোনোরকম ইতস্তত ন! করে
সিধে ভেতরে ঢুকে গেল কস্তরী। মহেন্দ্র বর্ণনার সঙ্গে শুধু
একটি জিনিস মিললো না। একতলা বাদে দোতল। থেকে
ওপরতল। পর্যন্ত সবটাই একট। হোটেল। বড় বড় বাংল! অক্ষরে
লেখা £
“পরিবার বান।'
বাইরে থেকে দেখে ঘ! মনে হলো খানদশেকের বেশি ঘর নেই
৪২
পরিবার বাসা'য়। অফিসে ঢুকে পড়ি আমি | থান পরনে একজন
মোটাসোটা বিধবা মহিলা বসে উল বুনছিল।
ভণিতা না করে বলে উঠি, “ঘর নিতে আসি নি। এইমাত্র যে
ভদ্রমহিলাটি ভেতরে গেলেন, তার নাম কি?
“কে আপনি ?
পকেট থেকে একটা পুরোন আইডে্টিটি কার্ড বার করে এগিয়ে
দিলাম | ডিটেকটিভ থাকাকালীন এই কার্ট যত কাজে না-লাগুক,
এখন তা! লাগল । পুরোন পাইপ, কাগজ, বিলের সঙ্গে কার্ডটিও
রেখে দিয়েছিলাম মানিব্যাগে | কোনো দরকারে আসবে না জেনেও
কেন জানি এরকম বনু পুরোন জিনিসকে ফেলে দিতে পারি না।
[কন্ত এহ নিবোধ অভ্যাসই আজ অনেক সহজ করে তুললে আমার
গোপন তদন্তকে।
চোখ তুলে বললে বিধবা, কস্তুরী কৌশিক 1,
“নিশ্চয় এই প্রথমবার দেখছেন না৷ ওকে ?
প্রায়ই আসেন উনি।'
“কারও সঙ্গে দেখা করতে আসেন কি?
“উনি ভদ্রঘরের মেয়ে 1
বন্ধু-বান্ধব, অথবা অন্য কেউই কি ওব সঙ্গে এখানে দেখা
করতে আসেন না?
না1। আজ পর্যন্ত আপনি ছাড়া আর কেউ আসে নি।,
“তাহলে এখানে উনি করেন কি?
জানি না; ও কাজ আমার নয়।;
“ওর ঘরের নাম্বার কত ?
“উনিশ | তিনতলা ।,
“এ হোটেলের সব চাইতে ভাল ঘর নিশ্চয় ?
'না; তবে ভাল-ভাল ফানমিচার আছে! বারে! নম্বর ঘর দ্রিতে
চেয়েছিল।ম, উনি নেন নি। ওই ঘরটিই উনি চান।”
৪৩.
কেন ?
“তা বলেন নি। খুব সম্ভব ঘরটার বেশি রোদ্ব,র পড়ে__তাই।”
পার্মানেণলি নিয়েছেন নিশ্চয় ?
“একমাসের জন্য নিয়েছেন 1,
“কবে এসেছেন ?'
উলের কাটা টেবিলের ওপর রেখে রেজিস্টারের পাতা ওলটালে
বিধবা মহিলা ।
হপ্তা তিনেক হলো! বলেই তো মনে হয়। হ্যা, এই তো ৬ই
এপ্রিল |”
“কতক্ষণ থাকেন ঘরের মধ্যে ; অনেকক্ষণ নিশ্চয় %
“কখনও ঘণ্টাখাটেক, কখনও ঘণ্টাছুয়েক 1
“সঙ্গে মালপত্র আছে তো ?
“না, কোনো লাগেজ নেই ।,
নিশ্চয়ই প্রতিদিন আসেন না, তাই না ?
“না, হণ্তায় ছুদিন কি তিনদিন |”
“ভদ্রমহিলার হাবভাব একটু অদ্ভুত নয় কি? এ সম্বন্ধে কিছু
ভেবেছেন এর আগে?
কপালের ওপর স্বুতো বীধা চশমাটা ঠেলে তুলে দিয়ে
প্রৌটা চোখ রগড়াতে রগড়াতে বলল, 'াঁচরকম লোক এখানে
আসছে তো, ওরকম খাপছাড়া শ্বতাব সবারই একটু-আধটু
থাকে । হোটেলে কাজ করলে এরকম প্রশ্ন করতেই পারতেন
না 1,
“আপনাদের টেলিফোন আছে দেখছি। উনি ফোন করেন
কাউকে ?
না ।
“ফোন আসে না ঠ
না
88
“কত বছর হল হোটেল বানানো হয়েছে এ-বাড়িতে, তা জানেন
কি?”
'জানি | বছর পঞ্চাশ হল,
তার আগে £
গেরস্থবাড়ি ছিল। অন্তত আমার তো তাই মনে হয়।'
“উম! দেবী বলে কারও নাম শুনেছেন কি !
নী। রেজিস্টার দেখব কি %
“দরকার নেই ।?
ভাবলেশহীন মুখে আবার টলের কাটার দিকে চোখ নামালো!
বিধবা! প্রোডা। আর আমি সের মত দাড়িয়ে না থেকে বেরিয়ে
এলাম বাইরে |
তিনতল।র ওই বিশেষ ঘরটিতে কিসের সন্ধান পেয়েছে কস্তরী ?
কিআছে ও-ঘরে ? উমা দেবীর শোবার ঘর ছিল কি? কোন
রহস্যময় অকষণে এত দূরে এই বিশেষ বাড়ির বিশেষ ঘরটিতে এসে
উঠেছে কস্তবরী কৌশিক ? অনেক কথাই ভিড় করে এলো মনে":
অঙাব্দিয় শক্তি নয় তো?
ফুটপাতের ভিড়ের মধ্যে আপন মনে পায়চারি করতে করতে
হঠাৎ চমকে উঠলাম আমি । কন্তুরী নেমে এসেছে রাস্তায় প্রায়
আধঘণ্টার মত হোটেলে ছিল ও। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে ।
চোঁখে পড়ল একট। ট্যাক্সি । সঙ্গে সঙ্গে হাতের ইঙ্গিতে ট্যাক্সি
থামিয়ে উঠে পড়ল ভেতরে ।
চীৎপুরের মত রাস্তার চাইলেই তো আর ট্যান্সি পাওয়া ন।|
কিন্ত আমার কপাল ভালো । ঠিক পেছনেই আব একটা খালি
ট্যাঞ্সি। হাঁপাতে হাপাতে উঠে বসলাম তেতরে।
ভাঙাচোরা লোহালক্ড়ের স্ুপের পাশে দাড়াল সামনের ট্যাক্সি ।
নেমে দাড়াল কস্তরী | অলস মন্থর চরণে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল
৩৫
সামনে । ভগীকৃত মরচে-্ধরা লোহা, পাইপ আর নোঙরের মধ্য
দিয়ে পথ করে নিয়ে এমন এলোমেলো ভাবে হাঁটতে লাগল যেন
গ্তব্যস্থান কি, তাই সে জানে না। যেন নিছক বেড়ানোই উদ্দেশ্য
-আর কিছু নয়। চীৎপুরের জনবহুল অঞ্চলের হোটেল “পরিবার
বাসা আর গঙ্গার ধারের এই জনবিরল অঞ্চলের মধো যোগস্থত্রটা
যে কোথায়, তাই ভেবে পেলাম না| ইচ্ছে হল, কন্ত্ররীকে পেরিয়ে
যাই। কোন কথা নয়, আলাপ নয়, শুধু হেঁটে যাই পাশাপাশি ।
কথার দরকার কি, নদীর বুকে ভাসমান বয়াগুলোর ওপর চোখ
রেখে পাশাপাশি হাটুক ছুটি নির্বাক মুতি| কিন্তু না, তা সম্ভব
নয়। কাজেই এগিয়ে যাওয়ার প্রলোভনকে সামাল দেওয়ার জন্যেই
একেবারেই থমকে দাড়িয়ে গেলাম। অনেকখানি এগিয়ে গেছে
কন্তরী | মনে হল বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু পিছু নেওয়ার মধো
এমন একটা মাদকতা আছে, যা শুর করলে আর শেষ কবা যায়
না। তাই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম আরো সামনে |
কোথাও জড়ো! করা রয়েছে দড়ির গাদা, কোথাও ভাঁডা ইট।
কোথাও খোয়া, কোথাও বালি, কোথাও পিপে, আবার কোথাও
ভাঙা প্যাকিং কেস ' মরচে ধরা রেললাইনও দেখা যাচ্ছে মাঝে
মাঝে.**ওদিকে মাথা উঁচু করে রয়েছে একট! ক্রেন*" "গঙ্গার ওপারে
জুটমিলের চিমনি দেখা যাচ্ছে'--বিষ্ন এই শহরতলীতে কিসের
আকর্ষণে ছুটে এলো! কস্তুরী? আমর! ছুজন ছাড়া আর কেউ নেই
এদিকে । কিছুই খেয়াল নেই কন্তরীর-আপন মনে একেবেঁকে
এগিয়ে চলেছে তো চলেছেই। আমাকে লক্ষ্য করা তো দূরের
'কথা, আমার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সজাগ থাকারও কোন লক্ষণ দেখা গেল
না ওর চলাফেরায়।
একটু একটু করে একটা অস্পষ্ট ভয় ঘিরে ধরে আমাকে ।
নদীর ধারে হাওয়া খেতে আসে নি কন্তরী। বিকৃত মস্তিক্ষরা
যেভাবে সব কিছুর সান্নিধ্য ত্যাগ করে পালিয়ে যেতে চায় অনেক
৪৬
দুরে-_একি তবে তাই ? না, নিছক স্মৃতিহীনতার ঘোর? আবার
জোরে জোরে পা চালাই আমি ।
একটা নিরাল। গুদোমের দিকে এগিয়ে চলেছে কন্তুরী। ইটের
গাথনির ওপরে টিনের শেড.*"সামনে একটা ছোট ঘর ' সম্ভবত
দীনোয়ানের আস্তানা । বড় বড় কতকগ্লে। প্যাকিং-কেস পড়েছিল
সামনে | একটার ওপব বসে পড়ল কন্তুরী |
একটু দূরে কয়েকটা বড় পিপেব আড়ালে থেকে সজাগ দৃষ্টি
মেলে রইলাম আমি । কি জানি কেন, এক মুহূর্তে জন্যেও ওই
অদ্ভুত মেয়েটিব ওপব থেকে নজর সবিয়ে আনার সাহস হল না
আমার |
হ্যাগ্ুব্যাগ থেকে এক তা কাগজ বাব করল কন্তনবী | হাতের
উস্টে। পিঠ বুলিয়ে দেখে নিলে পাকিং-কেসেব ওপরটা ভিজ কি
শুকনো । তীরপর ফাউন্টেন পেন বার করে ঝুকে পড়ল কাগজেব
ওপর | সামান্য আডষ্ট হয়ে উঠল সুঠাম দেহবল্লবী |
ভাঁবলাম, এই হল প্রিয় ঈমের জন্য শবরার প্রতীক্ষা ।
নিছক অন্ুমান। কতটুকুই বা তার মূলা । দয়িতকে চিঠি
লেখার দরকার হলে এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে এতদূরে আসার কোনো
প্রয়েজন আছে কি? এমন গোপনীয় চিঠি তো বাড়ির মধোই
পালস্কে শুয়ে শুয়ে লেখ যেতো--গঙ্গার এই বিজন তীরে আসার
দরকারটা কি?
সমানে লিখে চলেছে কন্কুবী। মস্থণ গভিতে এগিরে চলেছে
ঝরনা-কলম | সমস্ত চিঠিটাই যেন মনে মনে আগে থেকেই সাক্িয়ে
নিয়েছে ও; চিৎপুবেব হোটেলে আধ ঘণ্টা কেটেছে হয়তো এই
চিঠির বিষয় ভাবতেই ।
আবার অনুমান ! কি মুশকিল, অনুমান ছাড়া তো আকড়ে ধরাব
মতও কিছু নেই * আচ্ছা, মহেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক-ছেদের স্চন] নয়
তো? বিবাহ-বিচ্ছেদের প্রথম অধ্যায়? "তাহলে অবশ্য ওর এই
৪৭
অস্থির মনের একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু পাওয়া যায়
না উম! দেবীর সমাধি দর্শনের কোনো মোটিত।
দারোয়ানের ছোট্ট ঘর থেকে তখনও কেউ বাইরে এল না।
হয়তে। কেউ নেই ভেতরে _থাঁকলেও নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত |
চিঠিটা সন্তর্পণে ভাজ করল কস্তরী; ধীরে সুস্থে খামের মধ্যে
ভরে ফেলল। এবার কি করবে ও? যে-পথে এসেছে, সেই পথেই
ফিরবে নিশ্চয় | খামের ওপর ঠিকান। লেখ হয়ে গেল ওর। জিভ
বুলিয়ে মুখট৷ সেঁটে দিলে ভাল করে| তারপর আশেপাশে তাকিয়ে
নিয়ে উঠে দাড়াল । জামান্ত দ্বিধ। ফুটে উঠল তাবে ভঙ্গিমায় ।
হুনিবার হয়ে উঠল আমার কৌতুহল, খামের ওপর লেখা
ওই নাম-ঠিকানায় একবারটি চোখ বোলাতে চাই--বিনিময়ে স্বন্ব
দিতেও রাজি আছি আমি ।
তখনও দ্বিধাকাটে নি কন্তরীব | ফিরবে কি ফিরবে না, এমনি
দোনামোনা ভাব নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল ভাঙা-চোর৷
পাটাতনের পাশে। অদূরেই পিপের গাঁদার আড়ালে ঘাপটা মেরে
দাড়িয়েছিলাম আমি । এত কাছে এসে দীড়াল কস্তুরী যে, একটা
অদ্ভুত সুবাস ঝোড়ো ঝাপটাঁর মতই এসে লাঁগল নাকে । অল্প অল্প
বাতাস বইছে গঙ্গার দিক থেকে | শাড়িটা মু শব্দ করে উড়ছে
পেছনে । খুব, খুব শান্ত ওর মুখচ্ছবি, অন্তত পাশের দিকে থেকে যতটুকু
দেখা যায় । কোনো তরঙ্গ নেই সেই মুখে, যদিও বা থাকে কিছু, তবে
তা হতাশার অভিব্যক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। চোখ নামালো
কস্তুরী, উল্টে দেখল খামটা, তারপর আচমকা ছু-টুকরে! করে ছিড়ে
ফেললে । চার টুকরো! । আরও কুচি। আরও । আরও | শেষে
ছোটে। ছোটো কাগজের টুকরোগুলে উড়িয়ে দিলে বাতাসে । কিছু
নদীর জলে পড়ল, কিছু তাঁসতে ভাসতে এসে পড়ল ঘাসের ওপর ।
পাথরের মত মুখে জলের ওপর ভাসমান কাগজগুচলোর দিকে
তাকিয়ে রইল ও। শৃন্যগর্ দৃষ্টি | বাঁঁহাতের বুড়ো আঙুলটা একবার
৪৮
রগড়ালে ডান হাঁতের চেটোয়--যেন কোনো অপ্রিয় অদৃশ্য বস্তুকে
মুছে ফেলতে চাইছে ভালু থেকে । জুতোর ডগ। দিয়ে ঘাসের ওপর
থেকে কয়েকটা কাগজের কুচিকে খুঁটে ঠেলে দিলে জলের দিকে ।
তারপর প্রশান্ত মুখে পা বাড়ালে সামনে ।
ঘাসের ওপরেও ছলকে উঠল খানিকটা জল।
“কন্তরী
এক মুহূর্ত স্থাণুব মত ফঈীড়িয়ে রইলাম আমি । কয়েক টুকরো
কাগজ ছাড়া বাকি সবই জলে পড়েছে । ছন্নছাঁড়াব মত উড়ে
বেড়াচ্ছে এই কয়েকটা কুচো।
কম্তুরী !,
বুশসার্টটা একটানে খুলে ফেলে ছুটে এলাম কিনারায়৷
বলয়াকারে ছড়িয়ে পড়ছে নদীর জল | সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপ দিলাম
জলে। রখ নিশ্বাসে ক্ষিপ্তেব মত হাতড়াতে লাগলাম সামনে ।
দেহের অণুপরমাণু থেকে কেবলমাত্র একটি নামই ক্রমাগত ঠেলে
উঠে আসতে লাগল ঠোটের ডগায় £ কিন্তরী ! কন্তবী!
কিনারার কাছে নোংরা ঘোল।টে জলে খুব জোর সেকেওড ছয়েক
রইলান। পরক্ষণেই ভেসে উঠলাম ওপরে | তর টানে বেশ
কয়েক গজ ভেসে গেছে কস্তুরী। চিৎ হয়ে ভাসছে ও, ডুবে যাওয়া
মানুষের মতই শিথিল সবাঙ্গ। কাছাকাছি পোছতে ন!
পৌছতেই দেখি, একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে কস্তুরী। ঠিক যেন
একতাল নরম ঠাণ্ডা মাংসের দলা প্রাণের চিহ্ন নেই বললেই চলে ।
হাপাচ্ছিলাম আমি | কমজোরি হাপরের মতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল
ফুসফুস জোড়া । হাত-পাগুলো ভারি হয়ে উঠেছিল লোহার মত|
হাত বাড়িয়ে ক্তরীর ঘাড়ের কাছট। আকড়ে ধরলাম । যেভাবেই
হোক, মাথাকে তৃলে রাখতে হবে জলের ওপর । অপর হাতে জল
টেনে এগিয়ে চললাম তীরের দিকে । শক্তি খরচের অনুপাতে কাজ
হল খুব অল্প| তীর অনেক দূরে । কি অসম্ভব ভারি কন্তবী !
৪৯
এর মধ্যেই যেন গঙ্গার মাটির মধ্যে গেঁথে যেতে শুরু করেছে
তন্ুলতা ! বয়াগুলো৷ বেগে বেরিয়ে যাচ্ছে পাশ দিয়ে, শোতের
টানে হু-ছু করে ভেসে চলেছি ছুজনে। আর বেশি দূর নেই |
কিন্ত আর তো পারছি না আমি। ফুসফুসে আর জোর নেই।
শবীরটাকে সুস্থ রাখার জন্তে কোনদিন মাথা ঘামাই নি। হা করে
বুকভর! বাতাস নিতে গিয়ে বেশ খানিকটা গঙ্গাজল গিলে ফেলি
এবার |
কয়েকটা ধাঁপ-""একটা৷ ঘাট দেখা যাচ্ছে । পাশেই একটা!
নৌকো বাঁধা । ওই দড়িটা **ওই দড়িটা যেতাবেই হোক ধরতে
হবে আমাকে । ধাপ কণ্টায় একবার উঠে দাড়াতে পারলে " এসে
গেছে.-"অনেকটা কাছে এসে গেছে "হাত বাড়িয়ে কোনোমতে
দড়িটা ধরে ফেললাম-*'টেনে আনলাম নিজেকে." পাওয়া গেছে
পায়ের তলায় সি'ড়ির ধাপ।
এবার কন্তরীকে তোলাব পালা । এক একটা ধাপ টেনে তুলে
বেদম হয়ে হাঁপাতে থাঁকি কিছুক্ষণ । বৃষ্টির মত জল বারে পড়ছে
ছুজনের দেহ থেকে । জল থেকে ঠিক ওপরের ধাপটার সংজ্ঞাহীন
দেহট] তুলে এনে শুইয়ে দিলাম | এক মিনিট । জল একটু ঝরে
গেলেই নিশ্চয় অনেকটা হাক্কা হয়ে যাবে কম্তরী। একটু জিরিয়ে
নিয়ে আবার নিচু হলাম আমি | খানিকটা তুলে ধরে, খানিকটা!
হি'চড়ে টেনে পৌছলাম সিঁড়ির একদম ওপরেব ধাপে । পবের
মুহূর্তেই তেডে পড়লাম নিজে । শবীরের শেষ শক্তি-বিন্দুটুকুও
গেছে ফুরিয়ে । কস্তরীই সবার আগে নড়ে উঠল। কি করুণ
সেই ছবি! গালের ওপব লেপ্টে রয়েছে কালে কুস্তল। গালের
রক্তাভা জলের মধ্যেই মিলিয়ে গেছে। চোখের পাতা খোলা,
বেদনাঘন দৃষ্টিজাল আকাশের পানে মেলে ধরে কি যেন চেনবার
চেষ্টা করছে সে।
এখনও মরেন নি আপনি |” ছোট্র করে বললাম আমি ।
৫০৩
চোখের মণিছুটো আস্তে আন্তে ঘুরে গিয়ে স্থির হয়ে রইল
আমার পানে-_যেন অন্য এক জগত থেকে এই পৃথিবীর মানুষের
পানে অবাক চাহনি মেলে ধরেছে কন্তুরী কৌশিক | বলল ফিস-
ফিস সুরে, মরতে আমার তালো লাগে )'
ুব হয়েছে, এবার দয়া করে উঠে বসুন |,
কিন্ত তখনও উঠে বসার মত অবস্থায় আসতে পারে নি কস্ত্বরী ।
মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসার বিহ্বলতা তখনও পুরোপুরি কাটে নি,
তাই আনিই ওকে পাজাকোলা করে তুলে নিলাম। দারোয়ানের
ছোট্ট ঘরটা ঘাট থেকেই দ্রেখা যাচ্ছিল ; বেশি দূরে নয়। গুরুতার
নিয়ে অবসন্ন পা-ছুটোকে টানতে টানতে যেন একযুগ পরে এসে
ঈড়ালাম ঘরটার সামনে ।
“কৌন হ্যায় ?
কোঁনো সাড়া নেই। চৌকাঠের ওপর পা! রাখতেই ছেঁড়া চটের
পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একজন হিন্দুস্থানী বউ; কোলে
নবজাত শিশু। খুব সন্তব রসুই নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
ভিজে-কাকের মত চেহারা দেখেই চমকে উঠল বউটি, “কেয়া
হুয়া বাবুজী ?
“বিপদ, ভারি বিপদ | ইনি জলে ডুবে গিয়েছিলেন ; শুকনো
কাপড়-চোপড় আছে £
জরুর | আইয়ে, অন্দরমে আইয়ে। কোলের শিশু কেঁদে
উঠল | বউটি তাড়াতাড়ি ঘরের কোণে খাটিয়ায় পাঁত। মলিন চাদরটা
এক হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাঁড়তে বললে, “বৈঠিয়ে, হিয়া বৈঠিয়ে ।'
আমি আর বসলাম না। আলতো! করে কস্ত্বরীকে শুইয়ে দিয়ে
বেরিয়ে পড়লাম । পিপেগুলোর আড়ালে বুশসার্টটা ফেলে এসেছি,
টাকাকড়িও রয়েছে সার্টের পকেটেই।
যথাস্থানেই পড়েছিল সার্টটা1 | মানিব্যাগও খোয়া যায় নি]
এই মাত্র ষে ভয়ানক কাণ্ড ঘটে গেল, তার কোন চিহ্ন ছিল ন।
৫০
গঙ্গার ঘোলা!জলে। অথচ কিছুতেইভুলতে পারছিলাম না সেই দৃশ্য-_
কিনার। পেরিয়ে শুন্যে একটা পা এগিয়ে দিয়েছে কন্তুরী, শাস্ত, সুন্দর
মুখচ্ছবি-*-উদ্বেগের বিন্দুমীত্র ছায়া নেই সে-মুখে-'জলে পড়েও
ধীর স্থির তার দেহ। হাত-পা ছোড়া নেই, মৃত্যুর সিংদরজ। দেখেও
শিউরে উঠে হীকপাঁক করা নেই-_-অচঞ্চল মুখে জলের মধ্যে তলিয়ে
যাওয়ার সেই ভয়াবহ দৃশ্য কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে
পারছিলাম না আমি । মৃত্যুর কোলে এমনি করে কি কেউ নিজেকে
নিঃশেষে সপে দিতে পারে ? না, না, এ মেয়েকে কিছুতেই চোখের
আড়াল করা চলে না, কখনোই না। ছুটতে ছুটতে ফিরে আসি
আমি। বর্তন থেকে ছুটে! গেলাসে গরম ছুধ ঢালছিল হিন্দুস্থানী
বউটি।
“কোথায় গেলেন উনি £
ইজিতে পর্দার ওদিকে দেখিয়ে দিল মেয়েটি । আড়াল থেকে
বেরিয়ে এলো কস্থরী। পরনে একট] সস্তার ফুলকাট। ছাঁপ। শাড়ি ।
ভিজে চুলগুলো! এলিয়ে পড়েছে সারা পিঠে । মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে
রইলাম । বিধাভা যাকে রূপ দেন, তাঁকে এমনি অক্পণ হাতে
সাজিয়ে দেন, বসনে দপ্রিদ্র হয়েও তাই অপরূপ মনে হল
কন্তরীকে। |
একট ধুতি আর কামিজ এগিয়ে ধরেছিল বউটি। বেঢপ হলেই
বা আর উপায় কি। গজগজ করতে করতে তাই নিয়ে পর্দার
আড়ালে গিয়ে জামাকাপড় পান্টে নিলাম। কামিজট। পরলাম
না। বুশসার্টিটা গায়ে দিলান শুকনো ধুতির ওপর । দারুণ রাগ
হয়ে গেল মহেন্দ্রের ওপর | ছুটো! দশ টাকার নোট বউটির হাতে
গুজে দিয়ে হন হন করে বেরিয়ে এলাম বাইরে।
দরজার ঠিক বাইরে বিচিত্র বেশে দীড়িয়েছিল কস্তরী। কোলে
দিগম্বর শিশুটি | “চলুন, যাওয়া যাক 1 রুক্ষ স্বরে বলি আমি ।
চুপ” ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল কন্তরী। “ঘুম
৫২
তেডে যাবে 1 বলে, সন্তর্পণে শশশুটিকে তুলে দিলে মায়ের
কোলে । ভিজে পোশাকগুলো দল পাকিয়ে হাতে তুলে দিল
বউটি।
যেতে যেতে নিরুত্তাপ স্বরে শুধোলাম, “কোথায় পৌছে দেবে
আপনাকে ?
প্রথমে আপনার বাড়িতেই যাওয়া যাক। ময়লা ধুতিটা না
ছাড়া পর্ষস্ত আপনার মেজাজ ঠাণ্ডা হবে না, তাই না?
“কোথায় থাকেন আপনি ?
“নিউ আলিপুরে--*আমার নাম কন্থরী কৌশিক * স্বামী মহেন্দ্র
কৌশিক " নিমতায় কারখানা আছে।'
“আমি হুর্লত সাঁমন্ত। পেশায় ব্যবহারজীবি, অর্থাৎ উকিল,
একটু চুপ। তাবপর, “আপনি আমার গপর ভীষণ রেগেছেন,
বলল কন্তরী । “কিন্তু কি হয়েছে বলুন তো ? বিশ্বাস ককন, আমি
কিছুই জানি না।;
আত্মহত্যা করতে গেছলেন আপনি ॥
আশা করেছিলাম এবাব কিছু বলবে কন্তরী | কিন্ত নিধিকাঁব
মুখে কোন ভাব-পরিবর্তন না দেখে আবার বললাম, “আপনি
আমার ওপর তরসা রাখতে পাবেন""'জানি আপনার অনেক হুঃখ
“কোন শকৃ যদি পেয়ে থাকেন'”
“না, মৃদু স্বরে বলল কস্তরী, “য। ভাবছেন, তা নয় ।,
সঙ্গে সঙ্গে ঘোষপাড়ার দেখ। কন্তুরী ফিরে এলো। আমার পাশে,
হুব্ছু সেই রহস্যময় তাবঙন্ময়তা ফুটে উঠল কুচকুচে কালো
চাহনিতে ।
বলল, “গঙ্গার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু কেন, তা
জানি না।;
“বটে! তাহলে চিঠিটা কার নামে শুনি ?
লাল হয়ে উঠল কস্তুরী।
৫৩
স্বামীকে লিখেছিলাম । কিন্তু যা বোঝাতে চেয়েছিলাম চিঠির
মধ্যে, তা এমনই অস্বাভাবিক যে শেষকালে--” বলে, মুখ তুলে
হাতের ওপর হাত রেখে শুধোল, “আবার বেঁচে থাক কি সম্ভব হবে
আমার পক্ষে ?'”মানে মৃত্যুর" -পর *.আঁর কেউ হয়ে বেঁচে থাকা
'কি সম্ভব ?."আপনিও এডিয়ে যাচ্ছেন, উত্তর দিতে চাইছেন ন||
ভাবছেন, আমি পাগল 1,
শশুমুন__;
“আমি পাগল নই,বিশ্বীস করুন,আমি পাগল নই."-কিস্ত আমার
অতীত যে অনেক, অনেক দূর ছড়িয়ে আছে, ছেলেবেলার স্মৃতিরও
অনেক ওপারে-_-এই অনুভূতিটাকে আমি কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে
পারি না মন থেকে | মনে পড়ে, ছোট্ট থাকার আগেও আমার একটা
জীবন আছে। মানে_ ছিল, আস্তে আস্তে তার সবকিছুই আমার
মনে পড়ছে." কিন্ত এসব কথা আপনাকে বলছি কেন, বুঝছি ন1 1;
বিলুন, বলে যান ।”
“যেসব জিনিস কোনদিন দেখি নি, তাও মনে করতে পারি
'আমি। মাঝে মাঝে মনে পড়ে অনেক মুখ- কখনও দৃশ্যের পর
দৃশ্ঠট | মধ্যে মধো সমস্ত শ্ন্তর দিয়ে উপলব্ধি করি, আমি তরুণী
নয়, বুড়ি, অনেক বেশি আমার বয়স 1,
আচ্ছন্গের মত কথ! বলে চলেছিল কন্তরী । গাট হয়ে এসেছিল
্বর। দ্রেত নয়, থেমে থেমে প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট অথচ ফিসফিসিয়ে
উচ্চারণ করে .চলেছিল সে । আড়ষ্ট হয়ে শুনতে লাগলাম আমি ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল কক্ত্রী, “নিশ্চয় কোন অন্থুখে ভুগছি আমি |
যদি তাই হয়, তাহলে যা কিছু আমার মনে পড়ে, সবই অস্পষ্ট,
আবছ1 হওয়াই উচিত ছিল, নয় কি? এত স্পষ্ট হবে কেন
মুখগুলো ?
“কিন্ত আজ আপনি ঝেৌঁকের মাথায় যে কাজটা করলেন, তা৷
কি আগে থেকে মোটেই ভাবেন নি ?
৫8
“মনে তো হয় ভেবেচিন্তেই করেছি।--"দিনে দ্রিনে একটা
অনুভূতি জোরাল হয়ে উঠছে আমার মধ্যে--"আমি এখানে আগন্তক,
আমার প্রকৃত জীবন রয়েছে আমার পেছনে | যদি তাই হয়, এই
মেকি জীবনকে টেনে নিয়ে গিয়ে লাভ কি?'"-সবার কাছেই".
জীবন হল মৃত্যুর ঠিক বিপরীত..-আর, আমার কাছে-**
“এ ভাবে কথা বলাটা! ঠিক নয়। ন্বামীর কথ ভাবুন 1
“বেচারা ! ও যদি জানতে পারে-
না, উনি জানবেন না। আমাদের ছৃজজনের মধ্যেই সীনাবদ্ধ
থাকুক আপনার জীবনের এই রহস্য |
শেষের দিকে আপনা হতেই কোমল হয়ে এসেছিল আমার স্বর ।
চোখ তুলে হাসল কন্তরী। যেন সোনালি আভা দেখা দিল ছেড়া
ঘের আড়ালে।
“ঠিক বলেছেন। এ রহস্ত পিক্রেট হয়েই থাকুক আমাদের
মধ্যে | আমার কপাল ভালে ওই সময়ে ওখানে হাজির ছিলেন
আপনি ।'
তা ছিলাম। এই যে ট্যাক্সি-্যাক্জি॥ আচমকা] টেঁচিয়ে
উঠি আমি। এ আঞ্চলে এ সময়ে ট্যাক্সি পাওয়া আর ভগবান
পাওয়া একই জিনিস ।
উঠে বসি দুজনে । টপ গীয়ারে উড়ে চলে ট্যাক্সি। হাওয়ায়
উড়তে থাকে ভিজে চুল। খাদে স্বর নামিয়ে আপন মনেই বলে
কস্তরী, “এতক্ষণে মরে ভূত হয়ে যেতাম আমি |,
ট্যাক্সি থামে।
দরজ। খুলে দিই আমি, “আনুন, ঘরে আসুন | আমি ব্যাচেলর,
কাজেই ঘরটাও তত ঝকঝকে নয়, তাহলেও এখানে দীড়িয়ে থাকাটা
ভালো দেখায় না।”
তাগ্য ভালো», হলঘরে বা সিঁড়িতে কারোর সঙ্গে মুখোমুখি
৫৫
হলাম না। এই রকম পোশাক পর! অবস্থায় সুন্দরী যুবতীকে নিয়ে
ব্যাচ্লেরকে বাড়ি ফিরতে দেখলেই গুজব ছুটবে হাওয়ার আগে।
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এলো টেলিফোনের শব্দ |
সোফাসেটে কন্তরীকে বসিয়ে দৌড়ে গেলাম পাশের ঘরে।
হ্যালো !
মহেন্দ্র স্বর। “এর আগে ছু-ছবার ফোন করেও পাই নি
তোমায়। একটা জিনিস হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমার, তোমাকে
তা বলাই হয় নি--উমা দেবীর আত্মহত্যার ব্যাপারটা***জলে ডুবে
আত্মহত্যা করেছিলেন উনি। জানি না, খবরটা তোমার কোন
কাজে আসবে কিনা । তোমার রিপোর্ট কি? খবর আছে?
“দেখা হলে বলব । এখন ছাঁড়ছি।! মক্কেল রয়েছে ।”
৫৬
॥ চার ॥
নোট বইয়ের পাতা উপ্টোলাম। মে ৬ বিরাগ মিশোনো
চোঁখে তাকাই আাপয়েণ্টমেন্ট গুলোর দিকে | সবন্ুদ্ধ তিনটে কেস।
তার মধ্যে একটা বিবাহবিচ্ছেদ | ছুমুঠো ভাত জোটাতে গিয়ে না
জানি আরও কতদিন এইভাবে জীবনের মূল্যবান সময় গুলো নষ্ট
করতে হবে আমাকে |
টেবিলে বসে ফাইলটা টেনে নিলাম | ওপরে কোণে ঝরঝরে
অক্ষরে ইংরাজীতে টাইপ করা “কৌশিক কেস, শেষ কয়েকদিনের
পাতাগুলো অলস ভঙ্গিমায় উল্টে চললাম । এপ্রিল ২৭ | গঙ্গার
ধারে তেড়ানো। ২৮। লাইট হাউস সিনেম।। ২৯1 মোটরে
জি. টি. রোডে বর্ধমান পর্ষন্ত। ৩০ ফিরপোতে চা-পান | অনেকক্ষণ
হাসি ঠাট্টা। মে১। বারাকপুব লাটসাহেবের বাগানে । চমৎকার
ড্রাইভ করে কন্তরী। ২। চন্দননগরে গঙ্গার তীরে । ৩। দেখা
হয়নি। ৪1 লেকের ধারে রাত আটট। পর্যন্ত | €। আবার
ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড ধরে টানা ড্রাইভিং | "* |
আর আজকে মে ৬। আজ দিনের শেষে লিখবো ? কন্তরীকে
আমি তালবাসি। ওকে ছাড়া আমি বীচতে পারবো না । আজ
থেকে প্রতিটি দিনের গ্রন্থনা শুরু হবে এই তথ্যের ভিন্তিতেই।
একটি পরিত্যক্ত অন্তরে তুষের আগুনের মত ধিকিধিকি জ্বলছে
বিষণ্ন প্রেম । ভাবগতিক দেখে মনে হয়, কস্তরীর মনে কোনো
সন্দেহ জাগেনি। বন্ধুর মতই মিশেছে আমার সঙ্গে, বন্ধুর মত
মন খুলে কথা বলতে পারে যার সঙ্গে, এমনি একটি পুরুষের সাহচর্য
পেয়েই সে খুশি । এর চাইতে অধিক কিছ তার কল্পনাতেই এখনে
আসে নি। সেই কারণে বোধহয় স্বামীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে
৫৭
প্রেত-প্রেয়মী--৪
দেওয়ার কোনে তাগিদও অন্ুতব করে নি। আর, সুকৌশলে
নিজের অংশ অভিনয় অতিনয় করে চলেছি আমি। আইনবিদের
গোয়েন্দাগিরি আর অসামান্তা রূপসী যুবতীর সঙ্গ সুখ । দিনগুলে!
কাটছে ভালই ।
ফাইলটা বন্ধ করে সরিয়ে দিয়ে পা টান-টান করে ছড়িয়ে দিলে
টেবিলের তলায়-.*মাথা এলিয়ে দিলে চেয়ারের পিঠে" "কস্তরীর
ব্যাধি। কন্ত্বরী সুস্থ; অন্ুস্থ নয় মোটেই। তবুও কোথাও যেন
একটা গলদ থেকে গেছে।
ঠিক বলেছে মহেন্দ্র । আনন্দে-হুল্লোড়ে ওকে মাতিয়ে দিয়ে
আলোময় এই জীবনের অংশে ওকে ধরে রাখা কোনক্রমে বন্ধ হলে
অদ্ভুত এক তন্ময়তায় আবিল হয়ে ওঠে ওর ছুই চোখ ।
একদিন চায়েব পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বলেছিলাম,
“আপনাকে দেখলেই জনার কথ। মনে পড়ে যায় ।,
ভূক কুঁচকে শুধিয়েছিল কন্তরী, “কে সে মহাপুষ ?
“পুকষ নয়, মহিলা | মাহিম্মতীরাজ নীলধ্বজেব স্ত্রী |,
“বটে? ।
'জন। খুব গঙ্গাভক্ত ছিলেন | পাগডবদের সঙ্গে যুদ্ধে কৃষ্ণ না
থাকলে সবাই পুড়ে ছাই হয়ে যেত তার তেজে। পুত্রশোকে কাতর
হয়ে তিনি গঙ্গায় ঝাপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন ।,
521?
“আপনাকে জন! বলেই ডাকবো । জনা না বলে ঘ্বৃতাচী বললেই
বোধ হয় বেশি মানাতো, কিন্তু--;
“আপনার পৌরাণিক নামের ধাক্কায় আমার মাথা ঘুরছে । চুক-
চুক করে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বলেছিল কন্তরী, “জনা নামটা
অবশ্য মন্দ নয়। গঙ্গাব বুক থেকে আপনিই আমায় ফিরিয়ে
এনেছেন, এই তো ?
সেই দিন থেকে জন। নাম ধরেই ঠাট্টাচ্ছলে কন্তরীকে €েকেছি
৫৮৮
আমি। কন্তুরী নামে ডাকার সাহসও ছিল না আমার | তাছাড়া,
কন্তরী বিবাহিতা মহিলা-_-অপর পুরুষের ঘরনী। কিন্তু জনা তো
আমারই, একান্তভাবে আমার | জলের মধ্যে, মুখের পরতে পরতে
মৃত্যুর ছায়৷ নিয়ে ডুবন্ত কম্তরীকে আমিই তো ছু-হাতে জাপটে ধরে
টেনে এনেছি জীবনের আঙিনায়.
কিন্ত একি বোকামো করেছি আমি--'শৃন্ে কল্পনার সৌধ গড়ে
তুলে আশা-নিরশীর নিরস্তর ছন্দে কেন ক্ষতবিক্ষত করছি মনকে ?
কিন্তু তাতে কি আসে যায়! বেদনা-দরিয়র নিতলে আছে শাস্তি;
অনাবিল সুখ আর অফুরন্ত আনন্দের সত্যলোক। আশা-নিরাশার
জাল বুনে বরং তার উপকারই হয়েছে । ব্যর্থতার তিক্ততায় সম্প্রতি
ঘে নৈরাশ্য দেখা দিয়ছিল আামার অন্তর প্রকৃতিতে, তা আর নেই।
সে তয় নেই। অনুশোচনা নেই। না জানি কত দীর্ঘ বছর
প্রতীক্ষায় থেকেছে আমার নিঃসঙ্গ সত্তা, এই অপরূপ! নারীর জন্যে !
সম্ভবত বারো বছর বয়স থেকেই শুক হয়েছিল শবরীর প্রতীক্ষা ।
পস্পা তীরে মতঙ্গ খধষির আশ্রমে জটাবতী চীর-অজিন-ধারিণী
শবরী রামের আগমন প্রতীক্ষায় থেকেছে দীর্থকাল। আর
ছেলেবেলা থেকেই পাহাড়ের গুহায়, ছায়ায়, অন্ধকারে ঘুর-ঘুর করে,
মৃত্যু-স্তব্ধতার মধ্যে থেকে অশরীরী কল্পনায় বিভোর হয়ে দিন
গুণেছি আমি ।
ঝনঝন করে বেজে উঠল টেলিফোনের ঘণ্টা। ঝট্ করে তুলে
নিলাম রিসিতারট। ।
হ্যালে। '"আপনি ?**হাতে কাঁজ নেই?" হ্যা, হ্যা, পারব
বলেই মনে হয়. কাঁজ আছে অনেক, কিন্তু কোনোটাই জরুরী
নয়'-*আপনি হুকুম করলে অবশ্য--চমৎকার ; কিন্তু পাঁচটার আগেই
ফিরে আসতে চাই...কোথায় যাবো; ঠিক আছে, মিউজিয়াম ?
মাবেল প্যালেস? না, পরেশনাথ মন্দিরে হাওয়া খাওয়া ?1""না,
না, এখনও দেখার জিনিসের অভাব নেই--তাহলে ছুটোর সময়ে |,
৫৯
আস্তে আস্তে নামিয়ে রাখলাম রিসিভারটা। এমনভাবে
রাখলাম যেন এখনও কন্তুরীর বীণাক্ঠের শেষ অনুরণন রিমঝিম
রিমঝিম সুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে যন্ত্রটির মধ্যে |
জামাটা গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম । মকেলরা এসে ফিরে
যাক আরও একদিন-_একেবারে না এলেই তো! পারে! কিএসে
যায় তাতে । যুদ্ধের দামামা! বাজছে ভারতের বাইরে । রণ-প্রস্তরতি
বাংলার মাটিতেও। বিমান আক্রমণের আশঙ্কায় কত রকম
প্রস্ততিই চঙছে শহরের বুকে। বসস্তের লালিমা বুকে নিয়ে
সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে সবুজ ঘাসপাতা। প্রেমের সুষমা
যেন সৃর্যের সোনাগলা কিরণের মধ্য দিয়েই ঝরে ঝরে পড়ছে।
এসপ্ল্যানেডের দিকে পা চালালাম আমি ।
মনের দিক দিয়ে আমি সত্যিই নিঃশৈধষিত হয়ে গেছি । তাই
অবসন্ন মনে এদিকে ওদিকে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম স্নাযুগুলোকে
আবার সতেজ করে তোলার চেষ্টায় । চিন্তার শোতে ছেড়ে দিয়ে-
ছিলাম নিজেকে | অবাধ্য, ছুরস্ত চিন্তা, মগজকে শাসনের রক্তচক্ষু
দেখিয়ে কোনো লাভই নেই.*.তার চাইতে বরং এই ভাল-।
হঠাৎ চমক ভাঙলো একটা সাজানো দোকানের সামনে এসে ।
নিউমার্কেটের দোকনি। হরেকরকম বিচিত্র পণ্য থরেথরে সাজানো
কাচের ওদিকে । একটা ছোট্ট আয়নায় চোখ পড়ল। রোজউডের
ওপর হাতীর দ্রীতের কাজ-করা ফ্রেমে বাঁধানো এতটুকু আয়না
মুঠোর মধ্যে ধরা যায়, এত ছোট | কন্তরীকে উপহার দিতে
হবে সামান্ত এই জিনিসটা । আজই দেবো । জনার লাবণ্যকে
করার যোগ্যতা তো সব দর্পণের নেই | নীল
ফিতে দিয়ে বাঁধা মৌড়কে আয়নাটাকে পকেটে রেখে হাসি-যুখে
দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। কম্তুরী, কস্তরী, প্রিয়তমা
কন্তুরী !
ছুটোর সময়ে ময়দানে সেই বিশেষ বকুলগাছটার নিচে এসে
৩৩
দাড়ালাম | সময়ের হিসেবে কন্তরীও কম যায় না। কয়েক
মিনিটের মধ্যে সে-ও এসে পৌছোলো বকুলতলায়।
আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে অবাক হয়ে যাই আমি, “কি
ব্যাপার, আজ যে আগাগোড়া কালোর সমারোহ |
কালোকে আমি তালবাসি। কাঁলোই হল আমার আধারের
বাতি। পররুচি পরণা» প্রবাদের অস্তিত্ব না৷ থাকলে কালো ছাড়া
আর কিছুই পরতাম না আমি |;
“কিন্ত রউট।য় শোকের ছায়। রয়েছে, তাই নয় কি?
“নিশ্চয় নয়। বরং উ্টোটাই বলা যায় । জীবনের সব কিছুর
মধ্যেই একটা মানে খুঁজে পাওয়া যায় এই কালো! রঙের মাধ্যমে |
এই রও আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে মানুষের চিন্তাকে, জীবন-দর্শন
হয়ে ওঠে গম্ভীর ও গভীর |;
'আর যদ্দি নীল কি সবুজ রঙ পরেন ?
“জানি না, তখন কি ভাববো । হয়তো নিজেকে মনে করবো!
আকালের ওই উড়ন্ত টিয়াপাখি, অথবা এই বকুলগাছটার মতই
সৌরত বিতরণই আমার কাজ...বিভিন্ন রঙের কতকগুলো রহস্যময়
ধর্ম আছে, খুব ছোটবেল! থেকেই ভাবতাম আমি । বোধ হয় সেই
কারণেই ছবি আক। শুক করেছিলাম।!
“আমিও ছবি আকতাম | কিন্তু আমার ড্রইং এত ছুবল যে
শেষ পর্যস্ত--.
“তাতে কি? রওটাই তে। আসল ।,
“আপনার আকা ছবি দেখাবেন ?
'দেখার মত কিছু নয়। মাথামুণ্ড কিছুই বুঝবেন না আপনি।
নিচ্ছক স্বপ্নকে তুলির ডগায় আনতে চেষ্টা করেছি'"-স্বপ্নের রঙ"
আচ্ছা» স্বপ্নের মধ্যে অনেক রকম রঙ দেখেন না৷ আপনি?
“না| সমস্ত ধুলোর মত ধূসর, অথব' ফোটোগ্রাফের মত |”
“তাহলে আপনি বুঝবেন না, আপনি অন্ধ / বলে হেসে উঠল
৬১
কম্তরী। আলতো-করে আমার হাতট। টিপে দিয়ে জানিয়ে দিল এ
শুধু পরিহাস, আর কিছু নয়। তারপর বলল, 'ম্বপ্ন বাস্তবের
চাইতেও অনেক বেশি সুন্দর। কল্পনা করুন, অনেকগুলো অদ্ভুত
স্ন্দর রঙ একজায়গায় মিলেমিশে অপরূপ স্থবম। নিয়ে এসে পড়ছে
আপনার চোখে-*.আপনার গোটা মনটা! তরে উঠবে রঙের সাগরে-""
তখন নিজেকে মনে হবে মেকি'**ওই রঙই আসল । প্রত্যেক রাত্রে
ত্বপ্ন দেখি আমি-".আবেক দেশের স্বপ্ন |,
“তাই নাকি ;
ঘনিষ্ঠ হয়ে হীটতে থাকি দুজনে গাছের ছায়ায় ছায়ায়। জানি
না কোথায় চলেছি, জানার ইচ্ছেও নেই। এই তো! তাল, আমেজে
অবশ পদযুগল যেদিকে যায় যাক। বড় ভাল লাগে কন্তরীর
আজকের নিবিড় সাহচর্য । কিন্তু কর্তব্য ভুলি না| বলি, “ছেলে-
বেলায় অজানা জগতের চিন্তা আমাকেও পেয়ে বসেছিল। কাছে
ম্যাপ থাকলে দেখিয়ে দ্রিতাম ঠিক কোন জায়গ। থেকে শুরু হয়েছে
সে দেশের ।
“এ দেশ, সে দেশ নয়।,
“তা তো৷ নয়ই | আমার ন্বপ্রেব শেষে আছে অন্ধকার, আর
আপনার স্বপ্নের শেষে আছে রঙের বাহার । কিন্তু ছুটো স্বপ্নই
মিলেছে একই জায়গায়, একই দেশে ।'
তখন আপনি ছেলেমানুষ ছিলেন। এখন আর তা বিশ্বাস
করেন না। করেন কি?
করি""আপনার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকে করছি ।,
নীরবে কিছুক্ষণ হাটি ছুজনে। সমবেত সঙ্গীতের মতই ছন্দে-
ছন্দে তালে-তালে হুজনের পা পড়তে থাকে ঘাসজমির ওপর ।
চিন্তাধারাও এগিয়ে চলে একই সুরে | মিউজিয়ামের সামনে এসে
থমকে ধ্াড়াই। তারপর রাস্তা পেরিয়ে বিশাল তোরণের নিচ দিয়ে
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকি ছুজনে |
৬
বড় বড় পাথরের মৃত্তিগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে কণ্তুরী
বলে, “এটা বিশ্বাসের ব্যাপার। আমি জানি-"ন্বপ্পে দেখা সেই
দেশ হুবহু এই দেশের মত নয়।| কিন্তু তবুও কাউকে তা বল।
যায় না।'
বড় বড় শূন্ত দৃষ্টি মেলে পাথরের মৃত্তিগুলো৷ তাকিয়ে রইল
আমাদের পানে । পাথরের ব্লকে কত ছুবৌোধ্য হরফ, বন্থু বছর
আগেকার দেব-দেবী দানব-দানবী পশুপক্ষীর বিচিত্র প্রস্তর-আলেখ্য
গুলোও সেদিন নীরব সাক্ষী থাকে কস্তরীর গোপন রহস্তের ।
এর আগেও এখানে এসেছি আমি। অনেক " অনেকদিন
আগে। আমার পাশে ছিল আরেকজন পুরুষ"."কালো চাপদাড়ি
ছিল তাঁর গালে । বিড়বিড় করে বলে কম্তরী।
“ওট1 মনের ভূল। অনেকের ক্ষেত্রেই এরকম “আগে দেখেছি
ভাব দেখা ছে | ও কিছু নয়, খুবই সাধারণ'বাপার ।'
না, মনের ভুল নয়। প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি আমি আপনাকে
শোনাতে পারি-_ প্রত্যেকটা দৃশ্ঠ ছবির মত ভাসছে আমার চোখের
সামনে | যেমন ধরুন ন। কেন, এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে
ভাসছে ছোট্ট একটা গ্রাম। গ্রামটার নাম বলতে পারবো না;
বাংলাদেশে কিনা তাও বলতে পারবো না। প্রায় স্বপ্নের মধ্যে
দেখি, এই গ্রামের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি---ছোট্র একটা নদী
এ'কেববেঁকে চলে গিয়েছে গাঁয়ের ঠিক পাশ দিয়ে---ডান পারে আছে
একটা অনেক পুরোনে। শিবমন্দির--"ব। পারে সারি সারি ভালগাছ.**
তালগাছের ওপরে আমবনে ঘুরছে কয়েকটা ছাগল-..তার ওপাশে
একটা তাঙ কেনল্লা--"আধখানা বুরুজ দেখা যাচ্ছে আমবনের মাথার
ওপরে'**
“কিন্তু-“'এ গা তো আমার চেনা । গীয়ের নাম রতনপুর | নদীর
নাম মন্দাকিনী ।
“তা হবে|
৬৩
“কিস্ত এখন গেলে ভাঙা কেল্লার বিশেষ কিছু আর দেখা! যাবে
না। বুরুজটাও পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। তালগাছগুলো৷ সাফ
হয়ে গেছে ।
তখন ছিল গাছগুলো.."আমার সময়ে ছিল.**আর সেই
বটগাছটা 1...যে গাছের শেকড় বালিশের তলায় রেখে বন্ধ্যা বউর!
ঘুমোতো ?
“ভীম! বট !
দেখলেন তো?
আরও কতকগুলো বড় ঘর পেরিয়ে এলাম । ছুজনেই নীরব।
ডাইনোসরের মস্ত কঙ্কালটাও কারোর মনে বিস্ময় জাগাতে
পারলে না।
“কি নাম বললেন ? শুধোলে কম্তরী |
'গীয়ের নাম? রতনপুর |;
“একসময়ে নিশ্চয় সেখানে থাকতাম আমি |,
যখন খুব ছোট ছিলেন 1
“না,; শান্ত স্বরে বললে। কন্তরী-*-গত জন্মে।?
কিছুক্ষণ সব চুপ |
তারপর, জায়গাটা আপনি চিনলেন কি করে? শুধোলো
কস্তরী।
“আমি জন্মেছি সেই গ্রামে | এখনও মাঝে মাঝে যাই ।
বড় বড় আলমারিগুলোর ওপর শুন্য দৃষ্টি রেখে শুধোই-_
“ছেলেবেল! থেকেই আপনি এই স্বপ্ন দেখছেন ?
“না| আর পাঁচটা মেয়ের মতই ছিলাম আমি। তবে অল্প
কথা বলতাম, এক থাকতে তালবাসতাম ।'
“তাহলে '* শুরু হলো কখন ?
হঠাৎ! বেশিদিন আগে নয় ..আচমক1 একদিন মনে হলো
আমি যেন আমার বাড়িতে নেই, একজন অচেনা লোকের সঙ্গে
৬৩৪
রয়েছি। হঠাৎ ঘুম তেঙে গেলে অচেনা জায়গায় নিজেকে দেখে
মানুষ যেমন বিহ্বল হয়ে পড়ে, এও অনেকটা তেমনি |
“একটা কথ! জিজ্ঞেস করব | যদি রাগ না করেন তো,
বলি।,
“আমার কোনো গোপন কথা নেই” শান্ত স্বরে বলল
কন্তুরী।
তাহলে জিজ্ঞেস করতে পারি ?
“নিশ্চয় |
“আপনি কি'''মানে, আবার শেষ-যাওয়ার কথা চিন্তা
করেন?
থমকে দাড়িয়ে গেল কন্তরী। তাসা-ভাস! মায়াময় ছুই চোখে
মেলে তাকালো আমার পানে ।
“আপনি বুঝতে পারলেন না আমাকে | বলল ফিসফিস করে।
“ওটা আমার প্রশ্নের উত্তর হলো না ।?
খনিজ আকরের একটা শো-কেসের চারধারে ভিড় করে
দাড়িয়েছিল অনেকগুলো মেয়ে আর ছেলে । পাশ কাটিয়ে এগিয়ে
গেলাম আমি ।
কন্তরী বলল, উত্তরের জন্যে চাপ দেওয়াটা ঠিক নয়।;
“আমি দেব। দেব শুধু আপনার স্বার্থে নয়, আমারও স্বার্থে
€প্লিজ- হই
এত নরম সুরে বলল কন্তররী যে বাতাসের মতই ত৷ ভেসে এল
কানে | মনটা হঠাৎ কি রকম হয়ে গেল। একহাত দিয়ে কস্তরীকে
ঘিরে ধরে নিজের কাছে টেনে আনলাম | বেরিয়ে এলাম বারান্দায় ।
কেউ নেই। বললাম গাঁট স্বরে, “তুমি কি অন্ধ? দেখতে পাচ্ছে।
না আমি তোমায় ভালবাসি ? তোমাকে হারানোর শোক যে আমি
সহা করতে পারবে। ন! কন্তরী
যন্ত্রচালিত মানব-মানবীর মত পাশাপাশি হেঁটে চললাম দুজনে ।
৬৫
কতক্ষণ পরে কানের কাছে মুখ এনে বললাম ফিসফিস ব্বরে,
“তোমাকে আমার চাই.*'তোমাকে আমার দরকার-.*-আমার এই
তুচ্ছ বেঁচে থাকাকে ঘ্বণা করার শিক্ষ। তোমার কাছ থেকেই পেতে
চাই আমি."
চলুন যাওয়া যাক ।,
ঘরের পর ঘর পেরিয়ে এলাম | একদম গা ঘে'ষে অত্যন্ত নিবিড়
হয়ে হাটছিল কন্তরী | আগেই চাইতে উষ্ণ সেই সান্নিধ্য । সিঁড়ির
ওপর পা দিয়ে থমকে দীড়ালাম।
“এইমাত্র কি বললাম তোমাকে, তা মনে আছে নিশ্চয় ?
'আছে।
“আবার যদি তা বলি, রাগ করবে কি?
“না |,
“জনা, আমার জন1!---আরও কিছুক্ষণ ইাটলে হয় না? অনেক
কথাই বলার রয়েছে ছুজনের |”
“আজ থাক। আমি ক্লাস্ত। এখন বাঁড়ি যাই ।
বাস্তবকই একটু ফ্যাকাশে আর শঙ্কিত মনে হলো কস্তরীকে |
ট্যাক্সি ডাকছি। তার আগে আমার একটা ছোট্ট উপহার
আছে।
“কি?
“খুলে গ্াখো | আমার সামনেই খোলো! 1
মোড়কট। খুলে ফেলল কম্তরী। ছোট্ট অথচ সুন্দর আয়নাটার
বুকে নিজের প্রতিবিস্বর ওপর ক্ষণেক চোখ বুলিয়ে নিয়ে সুতোর
ঝোলানো কার্ডটা তুলে ধরলে । শুধু তিনটে শব লেখা ছিল কার্ডে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল কম্তরী ।
বলল, “চলুন ।'
“আগামীকাল দেখ। হচ্ছে তো ??
মাথা কাং করে সায় দিলো কন্তরী |
৬৬
কিলকাতার বাইরে যাওয়া যাবে খন. "না, না, আর কোনে কথা
নয়। আজকের বিকেলের এই স্থতিটুকু নিয়ে আমাকে অন্তত
কিছুক্ষণের জন্যে শান্তিতে থাকতে দাঁও...এই যে ট্যাক্সি...আর
একটা কথা... অতীতের দিকে আর ফিরে চেও না। বলে দরজাটা!
বন্ধ করে দিলাম |
অবসাদের ছোয়া আমার মনেও লেগেছিল। এ অবসাদ
অনাবিল প্রশান্তির-.'ক্লাস্তির নয়।
৬৭
॥ পাচ ॥
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল '.আওয়াজটা পরিচিত...সাইরেন। আশ-
পাশের ফ্ল্যাটে ছুমদাম শব্দ হচ্ছে দরছা খোল! আর বন্ধ করার।
নীচের তলায় ছুটেছে সবাই । অন্ধকার শহরকে তোলপাড় করে
সত্যিকারের ডাকিনীর মত নাঁকি সুরে কাদছে সাইরেন | আতংকে
উঠেছে ভয়ার্ত নাগরিকের! ভীতু | পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে
পড়ি আমি।
পরের দিন সকালে রেডিওর নব ঘুরিয়ে শুনলাম সেই একই
খবর-_ যুদ্ধ, যুদ্ধ, আর যুদ্ধ। সারা পৃথিবী জুড়ে বাজছে রণদামাম!।
দ্রিমি দ্রিমি শব্দ ভারতের শিয়রে হাজির । হাসি পেল। বোমার
ভয়ে শহর প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে । বোম আদৌ পড়বে কিনা
তারই ঠিক নেই, কিন্তু বাড়ি-ঘরদোর ছেড়ে এর মধোই গ্রামাঞ্চলে
পালাতে শুরু করেছে কলকাতার বীরপুরুষরা । ক্ষিদে পেয়েছে
-চনমন করছে পাকস্থলী । শরীরে ক্লান্তি বলে আর কিছুই নেই।
ঝন ঝন করে বেজে উঠলো টেলিফোন । কন্তবীর। সেই একই
সাক্ষাংস্থান। বেল! ছুটো।
সারা সকালটা চটপট কাজ করে গেলাম | মকেলদের সঙ্গে
দেখা করলাম। টেলিফোনের ঘ্যানঘ্যানানিতেও বিরক্ত হলাম না।
সবার ত্বরেই সেই একই উত্তেজনা__যে উত্তেজন। রয়েছে আমার
নিজের মধ্যেই । বোমার প্যানিক আরও ছড়িয়ে পড়েছে । ছুপুর
একটার মধ্যে একটা রেস্তোরায় ঢুকে খাওয়। সেরে নিলাম | কফির
কাপ নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মারলাম কিছুক্ষণ। তারপর
পৌঁছলাম বকুলতলায়।
কন্তরী আগেই এসে গেছিল। কিন্ত এ কোন শাড়ি পরেছে
৬৮
ও? সাদাসিধে বাদামি রঙের সেই ভাতের শাড়ি---তয়াবহ সেই
দিনটিতে কন্তরীর অঙ্গে ছিল এই শাঁড়িটিই..মুহুর্তের জন্যে শক্ত
মুঠোয় কন্তরীর কক্ি চেপে ধরি আমি। বলি, *পরীরটা আজ
বিশেষ তাল নেই। জাপানীদের তয়ে অবশ্য নয়। তুমি চালাও ।'
কম্তরীকেও বিশেষ সুস্থ বলে বলে মনে হল না; গাড়ি চলতেই
তা বুঝলাম-_গীয়ার চেঞ্জ করছে আওয়াজ করে, ব্রেক কষছে
আচমকা" গ্রিয়ারিংয়ের ওপর পালিশ-করা নখ গুলোও খুব স্থির বলে
মনে হল না।
শ্যামবাজারের মোড়ে এসে কস্তরী বললে, চিলো, অনেকদূর
কোথাও যাই | খুব সম্ভব এই আমাদের শেষ ড্রাইভিং 1'
কেন?
“কি 'য হবে, তা বলা মুশকিল | যাই হোক না কেন, আমাকে
হয়তো৷ কলকাত] ছেড়ে যেতে হবে |;
“কলকাতা ছেড়ে যাবে কেন? বোমা পড়ার সম্ভাবন৷ কিন্তু
খুবই কম। অনেক দিন ধরেই সাইরেন বাজছে শহরে- কিন্তু বোম'
পড়েছে কি?'
কোন জবাব নেই।
“তবে কি আমার জন্তেই-*.আমার জন্তেই তুমি ? *কস্তরী,
তোমার জীবনে আর শনি হয়ে থাকতে চাই ন। আমি আমি । দাও
--কথা দাও, যে চিঠি তুমি একবার ছি'ড়ে ফেলে দিয়েছিলে, সে চিঠি
যেন আর দ্বিতীয়বারের জন্যে তোমার হাতে লেখা না হয়-""কি
বলতে চাই ত। বুঝছে। নিশ্চয় ?
জিত দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে নিলে কন্তুরী। হঠাৎ গতি বাড়িরে
ওভারটেক করল একটা লরীকে | চিড়িয়ার মোড়ের ওপর দিয়ে
খসে-পড়া উক্কার মত ছিটকে বেরিয়ে গেল গাঁড়িটা। তারপরেই
কমে এল গতি।
সামনের রাস্তার ওপর চোখ রেখে উত্তর দিলে কম্তরী, “ও প্রসঙ্গ
৬৯
নিয়ে আর নাই বা আলোচনা করলে ?% একটু থেমে মিনতি মাখানো
গলায় আবার বললে, “কিছুক্ষণের জন্টে যুদ্ধ আর বোমাকেও ভূলে
যাও।?
কিন্তু কন্তরী, তোমার মনে আনন্দ নেই কেন?
জোর করে হাসবার চেষ্টা করল কন্তুরী, ফ্যাকাশে হাসি । বুকটা
মোচড় দিয়ে ওঠে আমার |
“কিছুই হয় নি আমার-দিবিব মুডে আছি। সত্যি বলছি।
দেখছে। না, কিরকম ড্রাইভ করছি? মেজাজ খারাপ থাকলে কি
এমনভাবে বেরোনে যায়? এমনিতাবেই যেখানে খুশি যেতে ইচ্ছে
যায়, না ভেবেচিস্তে সামনে যে রাস্তা পাওয়া যায়__সেই রাস্তা ধরেই
উধাও হতে যেতে চায় মনটা । মাঝে মাঝে ভাবি, জানোয়ার হয়ে
জন্মালাম না কেন ।'
“বলছো কি কস্তুরী !
“একটুও বাড়িয়ে বলছি না। জন্তদের আমি অন্ুকম্পা তো
করিই ন। বরং হিংসে হয় ওদের খুশিমত চলার স্বাধীনতা দেখে ।
খায়, ঘুমোয়, ছুটে বেড়ায়-_নিষ্পাপ, নিরীহ | অতীত নেই, ভবিষ্যংও
নেই ।,
“একি জীবনদর্শন !
“একে দর্শন বলে কিনা, তা জানি না| কিন্ত ওদের দেখলেই
ঈর্ষা হয় আমার |,
এরপর টুকরো টুকরে। কথা৷ ছাড়া আর কিছু জমলো! না।
পেছনে পড়ে রইল বেলঘরিয়া, আগরপাড়া, সোদপুর | পথের ঠিক
মাঝখান দিয়ে নিধিকারভাবে য।চ্ছিল একটা মোষ । বেপরোয়াভাবে
আচমকা ডানদিকে নেমে গিয়ে পাক রাস্তা ছেড়ে কাচা রাস্তার
ওপর গাড়ি নামিয়ে দিলে কন্তুরী। পরক্ষণেই লাফাতে লাফাতে
উঠে পড়ল সড়কে । ঝাকুনির চোটে গায়ের ওপর গিয়ে পড়েছিলাম |
স্পিডোমিটারের কাটাট! থরথর কবে কাপছে পঞ্চান্ন থেকে ষাট-এর
72
মধ্যে। কন্তরীর চোখে-মুখে কিন্ত কোন প্রতিক্রিয়া নেই এ-হেন
সর্বনীশ। বেগের । চোখের ওপর কয়েকগাছি চুল লেপটে ছিল-_
থিরথির করে কাপছিল দমক। হাওয়ায়-_কিন্তু তা সরাবার কোন
প্রচেষ্টাই দেখা যাচ্ছিল না ওর মধ্যে। হুইলের ওপর হাত টি
রেখে বসেছিল যন্ত্রের মত। ম্যামনগরের কাছাকাছি ঠেলাগাড়ি
নিয়ে রাস্ত। পার হচ্ছিল একজন মুসলমান । বুড়োকে সরে যাওয়ার
কোন সময় না দিয়ে সী করে ডান দিকের একটা সরু পথে নেমে
পড়ল কণ্তরী। একট। পরিশ্াক্ত ইটের পীজা পড়ে রইল পেছনে |
সামনে একটা চৌমাথা | ডান দ্রিকেই মোড় নিল কম্তরী- খুব সম্ভব
সেদ্রিকের ঝেপঝাড়ের রাশি রাঁশি ফুলের আকর্ষণে | বাঁশের বেড়ার
ওপাশ থেকে কালো কালো ছোপওলা একট! ধল। গাই বড়-বড়
চোখ মেলে তাকিয়ে রইল নৃত্যপর গাড়িটার দিকে ।
এমনাবে ড্রাইভ করছে কন্তরী, যেন একটু আস্তে চালালেই
দেরি হয়েযাবে। অথচ তাঢ়াছুড়ো করার কোন কারণ নেই।
কাচামাটির গর্তের ওপর দিয়ে তাই নাচতে নাচতে এগিয়ে চললে। চার-
চাকার যন্ত্রযান। ঘড়ির ওপর চোখ নামালাম ; এবার গাড়ি থামানো
দরকার । পাশাপাশি হাটতে ই(টতে কথার ছলে জেনে নেওয়। যাবে,
কেন কস্তরীর মন আজ এত উত্তল। | কিছু একট! লুকো বার চেষ্টা
করছে ও | মনের গহনে এমন একটা জিনিস লুকিয়ে রেখেছে,
য। দ্বিতীয় প্রাণীকে বলতে পারে নি-_খুব সম্ভব বিয়ের আগে থেকে
চলে এসেছে এই গোপনীয়তা । না বলার যাতনার বনিয়াদের
ওপরেই ধীরে ধীবে গড়ে উঠেছে ওর যত কিছু অস্বাভাবিক
আচরণ। তীব্র অন্ুতাপের দহনও তো থাকতে পারে মনের গহনে |
কম্তরী অসুস্থ নয়, উন্মাদ নয়, ছলনাময়ী নয়। তা৷ সত্বেও এমন কোন
রহব্য আছে ওর অতীত জীবনে যা কাউকে বলা যায় শা এতদিন
কাউকে বলতেও পারে নি-স্বামীকেও নয় | যতই এই নিয়ে ভাবতে
লাগলাম, ততই চিন্তাধারার যৌক্তিকতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে উঠতে
৭১
লাগলাম আমি | কিন্তু কোন্ অপরাধে অপরাধিনী সে? নিশ্চয়
গুরুতর কিছু ।
“চেনো ওই বুকজট1? আচম্ক! প্রশ্ন করে কন্তরী, “কোথায়
এসেছি বলো তো ?
“কোনটা ?.."ইয়ে'-*ওই বুরুজ ?..না'"'এদিকে কোনদিন
আসিই নি। এবার থাম যাক, সাড়ে তিনটে বাজলো |;
সামনেই একটা চত্বর-এক সময়ে তা পাথরে বাঁধানে। ছিল,
কিন্ত আজ তা এবড়ো-খেবড়ে। ঘেসো জমিতে পরিণত হয়েছে।
চত্বরের, মাঝেই বেজায় উঁচু বুকজটা। পেছনের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে
কেমন-জানি বেমানম ঠেকছিল। পেছনে গাছপালার ফাঁকে ফাকে
যে ধ্বংসৃপ দেখা যাচ্ছিল, নিশ্চয় ত৷ পরিত্যক্ত নীলকুঠির |
চত্বরের সামনে এসে গাড়ি ধ্াড় করালো কস্তরী |
অদ্ভুত গড়নটা। হঠাৎ দেখলে মুসলমান আমলের মিনারের
মত, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে মনে হবে ফিরিঙ্গিদের ওয়াচ-টাওয়ার |
তাই না? বলে কন্তরী।
“বেজায় উচুও বটে।;
পায়ে পায়ে বুকজের সামনে এসে দীড়িয়েছিলাম | কালের
শাসনে নীলকুঠি ভেঙে পড়লেও পরবর্তীকালে বহু মেরামতের চিহ্ন
সার! অঙ্গে নিয়ে নীল আকাশের দিকে মাথ! তুলে দাড়িয়েছিল
বুরজটা। ভেতরে ঢুকে পড়লীম ছজনে।
ফিমফিন করে বললে কস্তরী, কেউ এদিকে আসে না, কিস্ত
আগাছাও বিশেষ দেখছি না। বুরুজের বর্তমান মালিকের প্রাণে
শখ আছে বটে_ পিকনিক করার উপযুক্ত জায়গা |,
তাই বটে। ভাঙাচোরা নীলকুঠি, লম্বা! লম্বা গাছপালার ঘেসো-
চত্বর আর পুরোন বুরুজ-_সব মিলিয়ে আইডিয়াল প্লেস।
তেতরে ঢুকলাম অত্যন্ত মন্থর পায়ে। পাথরের বেদীর, ওপর
সি'ছুর মাখানো একটা কালো শিলার সামনে এসে হঠাৎ থমকে
৭৭
দাড়াল কম্তরী। পরক্ষণেই হাটু গেড়ে বসে পড়ে চোখ মুদে মাথ!
নিচু করে রইল কিছুক্ষণ। বাতাসের ছোয়া লেগে গোলাপের
পাপড়ি নড়ার মত অধরোষ্টঠে মৃছ কম্পন দেখে, পাথরের মুর্তির মত
অনড় হয়ে ধাড়িয়ে রইলাম। এ কিসের প্রার্থনা? কিসের
অনুশোচনা? কোন্ আত্মগ্লানি? গঙ্গার জলে তলিয়ে গিয়ে কি
সেদিন রৌরব পথযাত্রিণী হতে চেয়েছিল রহস্তময়ী কম্তরী? আর
কাঠের মত ধ্াড়িয়ে থাকতে পারলাম না, নতজানু হয়ে বসে পড়লাম
পাশে £ কস্তরী।
আস্তে আস্তে মাথ। তুললে কন্তরী; কাগজের মত সাদ! হয়ে
গেছে মুখ ।
“কি হয়েছে? কন্তরী, বলো আমাকে-"কি হয়েছে £
“কিছু হয় নি।” ফিসফিস করে উঠল কন্তরী। “ছর্লভ, তুমি
বিশ্বাস করো, এ ছনিয়ায় কিছুরই শেষ নেই, কিছুই একেবারে
শেষ হয়ে যায় না| আমরা মনে করি, এই শেষ-"কিস্ত তা নয়"
বলে অনেকক্ষণ ছুই করতলে মুখ লুকিয়ে রইল কম্তরী। তারপর
তাঙ! গলায় বললে, চলো, যাওয়া যাক 1:
উঠে দাড়িয়ে কালে। শিলার উদ্দেশে আর একবার কপালে ছু-
হাত ঠেকালে। ও | কনুই ধরে টান দিলাম আমি।
কোণের দিকে একট। কাঠের তক্তা-মার। দরজা, দরজার পরেই
ঘুরপাক-খাওয়া বাংলা-ইটের সি'ড়ি।
“কম্তরী, ও দরজ। নয়-_-ও সিড়ি ওপরে গেছে ।”
চারপাশট একটু দেখতে চাই জবাব দিলে কস্তরী।
“দেরি হয়ে যাচ্ছে !
“মিনিট খানেকের জন্যে উঠবে! আমি ।,
বলতে বলতে সিড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করে দিয়েছিল ও, কাজেই
অনিচ্ছাসত্বেও সি'ড়িতে পা দিলাম ।
“অত তাড়াতাড়ি যেও না, কম্তরী |
৭৩
প্রেত-প্রের়সী--«
সঙ্ীর্ঘ খিলানওলা সিঁড়ি-পথে গম্গম করে উঠল আমার
কণ্ঠস্বর । কিন্তু শুনেও শুনলো ন1 কম্তরী--ক্রুততর হয়ে উঠল ওর
চরণ। ছোট্ট একটা চাতালে পৌছে দেওয়ালের ফোকর দিয়ে
বাইরে তাকালাম--নীলকুঠির ভাঙা ছাদ দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে
তালগাছের সারি, তার ওপাশে মাঠে কাজ করছে কয়েকজন চাষী ।
এইটুকু উঁচুতে উঠেই অন্বস্তি বোধ করছিলাম । ফোকর থেকে চোখ
সরিয়ে নিয়ে আবার পা দিলাম সি'ড়ির ধাপে।
“কস্বরী "'ধাড়াও"..আমাকে উঠতে দাও ।;
বেদম হয়ে পড়েছিলাম আমি । দপদপ করছিল মাথার
শিরাগুলো। আর একটা চত্বর; আর একটা ফোকর। এবার
হু'শিয়ার হয়ে গেছি-_বাইরে তাকালাম না; চোখ রাখলাম
তেতর দ্িকে--নিচের দিকেও নয়। খাড়াই ধাপগুলো এমনভাবে
গোৎ খেয়ে চোখের আড়ালে হারিয়ে গেছে যে, দেখলেই গ!
শিরশির করে ওঠে । বুরুজের চারপাশে কাকের কর্কশ চিৎকার
শুনতে পেলাম। ঝেঁকের মাথায় উঠে তো! পড়লাম, নামব কি
করে?
*কম্তরী |"
উদ্বেগে কি রকম ভাঙ। ভাঙ। শোনাল নিজের স্বর । শেষকালে
কি এই অন্ধকারের মধ্যে ছেলেমানুষের মত গলা ছেড়ে কেদে উঠতে
হবে? ফোকরটার মধ্যে দিয়ে আলোর তির্যক রেখা চোখে
পড়ছিল। জানি ও-জায়গায় চোখ রাখলে মাথা! ঘুরে উঠবে।
তবুও ফোকরটার কাছে এসে বাইরে না তাকিয়ে পারলাম না।
গাছগুলোর মাথা ছাড়িয়ে এসেছি। নীলকুঠি আরও ছোট হয়ে
এসেছে । শিস দেওয়ার মত শব্দ করে বাইরের হাওয়া ফ্লোকর
দিয়ে আছড়ে পড়ছে মুখের ওপর | চাতালের সামনেই গ্লাকট!
দরজা। বন্ধ দরজ!। ঠেল! দিয়েও খুলতে পারলাম না । এখনও
চুড়োটা! আসে নি| দরজার ফাক দিয়েই দেখা যাচ্ছিল আরও এক
৭8
পাক ঘুরে উঠে গেছে সিঁড়ির সারি । কিন্তু সিঁড়ির পাশে দেওয়াল
আর নেই-_খোলা আকাশ।
'কস্তরী |.."দরজা। খোলো 1,
ক্ষিপ্তের মত পাল্লার ওপর ঘুষি মারতে লাগলাম | মতলব কি
কন্তরীর? কি করতে চায় ও?
'কম্তরী-..কস্তরী!' পাগলের মত টেঁচাতে থাকি আমি | “এ-
কাজ করে। না'"-করেো। না""'আমার কথা শোনো !
ব্যঙ্গ করে উঠল প্রতিধ্বনি : গম গমকরে উঠল গোটা বুরুজটা |
ক্ষিপ্তের মত ফিরে দীড়ালাম ফোকরটার দিকে । নাঃ ফোকর ঠিক
নয়, গবাক্ষ বলা যায়| বেশ বড় আকারের। কষ্টে স্থষ্টে বেকে
হুমড়ে একটা! মানুষের দেহ বেরিয়ে যেতে পারে । তারপরেই ফুট-
খানেক চওডা আলসেটায় পা দিয়ে দেওয়াল আকড়ে ঘুরে গেলেই
দরজার ওদিকে সিঁড়ির গোড়ায় পৌছোন যায়। চেষ্ট। করলে
যাওয়া যায় নিশ্চয়.'.যে কোন পুরুষের পক্ষে তা সম্ভব-..কিস্ত
আমার পক্ষে তা অসম্ভব! গেলেই পড়বো"'-মাথ। ঘুরে পড়ে
যাবো * নাঃ এ পথে যাওয়া অসম্ভব !
কস্তরী! কম্তরী!' বিকট ভাঙা গলায় আবার টেচিয়ে
উঠলাম | আবার--আবার।
উত্তরে ভেসে এলো একটা তীক্ষ আর্ত-চীংকার। সা করে
ফোকরের সামনে দিয়ে নেমে গেল একটা ছায়া । সজোরে
আঙুলের গাঁট কামড়ে ধরে নিঃসীম আতঙ্কে কাঠ হয়ে সময় গুনতে
লাগলাম- ছেলেবেলায় এমনি ভাবেই বিছ্যৎ আর বাজের
আওয়াজের মাঝের সময় গুনতাম আমি ।
ভেসে এলে! সেই বজনির্ধোষ ' বনু নীচ থেকে একটা তয়ন্কর
শব্ধ। মৃত্যুপথযাত্রীর মত দম আটকে-যাওয়া আকুল কণ্ঠে বার
বার ককিয়ে উঠলাম £
“কৃত্বরী.'কম্তরী'''না'. না নাত
৭৫
বসে পড়েছিলাম । ঈীড়িয়ে থাকার বিন্দুমাত্র শক্তিও ছিল না
হাঁটুতে | মনে হল, এবার জ্ঞান হারাব | না দীড়িয়েই বসে বসে
একটু একটু করে দেহটাকে টেনে টেনে নামাতে লাগলাম নীচে-_
এক ধাপ থেকে আর এক ধাপে- এক চাতাল থেকে আর এক
চাতালে। শামুকের মত গতি...কিন্ত এর বেশি আর কিছু করার
ক্ষমতাও ছিল না। গোঙাতে লাগলাম আতঙ্কে আর অপরিসীম
নিরাশায় | প্রথম চাঁতাঁলে নেমে একবার ফোকর দিয়ে বাইরে
তাকিয়েছিলাম | হাটু গেড়ে বসে উকি দিয়েছিলাম গবাক্ষের মধ্য
দিয়ে বাইরে ।
অনেক নীচে বী-দিকে ভাঙা পাথরের টুকরো আর ঘাসজমির
ওপর, ভীষণ ভাবে খাড়াই বুরুজের দেওয়ালের প্রায় গা ঘেষে
পড়েছিল বীতৎস তাবে দোমড়ানো৷ মোচড়ানে৷ আকারহীন কুৎসিত
বাদামী কাপড়ের একট। পিগু।
পাথরের ওপর খানিকটা রক্ত, একটা হা-কর! ভ্যানিটি ব্যাগ--
ফাক দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে হাতীর দীতের ফ্রেমে বাঁধানো ছোট্ট
একট। আয়না ।
অশ্রবাম্পে ঝাপসা হয়ে গেল সবকিছু | দেহটার কাছে
যাওয়ার কথাও আর ভাবতে পারলাম না। কন্তরী মারা গেছে।
সেই সাথে মৃত্যু হয়েছে দূর্লভ সামস্তর |
৬
॥ছয়।
দূর থেকেই ঝাপসা চোখে তাকালাম নিশ্প্রাণ দেহটির দিকে!
বুর্জ থেকে বেরিয়ে এসেছি বটে, কিন্তু আর এক পাও এগোবার
সামর্থ্য ছিল না। মনে পড়ল একদিন বিড়বিড় করে বলেছিল
কন্তরী £
“মরতে আমার ভালো লাগে ।
ইমমাইলের সম্বন্ধে সবাই তাই বলেছিল। কস্তরীর মতই
মাথ। নিচের দিকে করে আছড়ে পড়েছিল সে। যন্ত্রণা ভোগ
করার কোন সময়ই পায় নি। সত্যিই কি তাই? ফুটপাতের
পাথরে থে ংল গেছল ইসমাইলের মাথা, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে
পড়েছিল চারপাঁশে.*'
আর ভাবতে পারলাম না| হাসপাতালে গিয়ে ইসমাইলের
দেহাবশেষ দেখেছিলাম | কন্তরীর চাইতেও কম উঁচু জায়গা! থেকে
পড়েছিল সে। কল্পনায় সেই ভয়ঙ্কর সংঘর্ষ প্রতিটি সাধু দিয়ে
উপলব্ধি করলাম..'প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মত আচমকা রেণু রেণু হয়ে
গেছল মনটা-_-অণুপরমাণুতে গুঁড়িয়ে যাওয়া মূল্যবান আয়নার
মতই । পোশাকের একটা! প্রাণহীন দল। ছাড়। কম্তরীরও আর
কিছু অবশিষ্ট নেই !
জোর করে আরও কাছে এগিয়ে গেলাম । অসহ্য কষ্ট হলেও
আমাকে দেখতে হবে এই দৃশ্য | এ ঘটনার জন্যে দায়ী আমি নিজেই
_-না দেখে পালানোর পথ কি আছে? অশ্রুপর্দার মধ্যে দিয়ে একটা
ঝাপস। ছবি দেখলাম | দেখলাম, পাগলিনীর মত চুলের রাশি ছড়িয়ে
পড়েছে চোখে-মুখে-বুকে ; ফাঁক দিয়ে দেখ। যাচ্ছে রুধিররঞ্রিত
তিলোত্মানিন্দিত মুখটি ; যেন মোম দিয়ে গড়া একটি হাত ছড়িয়ে
৭৭
রয়েছে জমির ওপর-_অনামিকাঁয় চিকমিক করছে একটি আংটি।
সামর্যে কুলোলে ওই আংটিটি খুলে নিয়ে আসতাম, আমৃত্যু ধারণ
করতাম নি্ষের অঙুলে। কিন্তু সে-শক্তি নেই আমার। তাই
কুড়িয়ে নিলাম শুধু আয়নাটা।
একটু একটু করে পিছু হটে এলাম। নিনিমেষ দৃষ্টি রইল
নিপ্রাণ দেহপিগুটির ওপর--এমন ভাবে তাকিয়ে রইলাম যেন ও-
দেহের প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছি আমি স্বয়ং! আচন্থিতে
ভয়ানক ভয় ঘিরে ধরল আমাকে-__এ-ভয় সামনের ওই বীতৎস
তালগোল পাকানো দেহটিকে নিয়ে। কর্কশ শব্দে কাকা করে
ওপর দিয়ে উড়ে গেল কয়েকটা কাক।
পেছন ফিরেই দৌড়োলাম | হাতের শক্ত মুঠোয় ঘেমে উঠেছিল
আয়নাটা। এক দৌড়ে চত্বর পেরিয়ে উঠে বসলাম গাড়িতে ।
সব তে! শেষ হয়ে গেছে । ইহলোক থেকে কন্তরী বিদায় নিল
কেন, কোনোদিনই কেউ তা! জানতে পারবে না| জানতেও পারবে না
যে আমিও হাজির ছিলাম, থেকেও দরজার বাধা পেরিয়ে পৌছোতে
পারি নি বুরুজের চুড়োয়। উইগুস্রীনের ওপর নিজের ছায়া দেখে
মনে মনে এতটুকু হয়ে গেলাম আমি। নিদারুণ ধিক্কারে ভরে
উঠলে! সমস্ত অস্তর। এর চাইতে মরে যাওয়াও তালো। বেঁচে
থাকাটাও এখন নরকবাসের সামিল।
উদ্মাদের মত অনেকক্ষণ ড্রাইত করেছিলাম সেদিন । হঠাৎ সন্থিৎ
ফিরে আসতে সচমকে দেখলাম সোদপুরের মধ্য দিয়ে ঝড়ের মত
উড়ে চলেছে গাড়ি | ফীঁড়িতে গেলে হয় না? লোকজন জড়ো
করা উচিত নয় কি? না। আইনের চোখে কোনো অপরাধ করি
নি। উল্টে সবাই ভাববে কাপুরুষ:-'ছুর্লভ সামস্ত কাপুরুষ ! টিচুতে
ওঠার মত পৌরুষ তার নেই!
সন্ধ্যে ছটার সময়ে শ্যামবাজার পেরিয়ে কলকাতায় ঢুকাযাম।
মহেন্্রকে সব বলতে হবে| বলতেই হবে, পালিয়ে গেলে চলবে না ।
৭৮
একটা বারে ঢুকে চোখে মুখে জল ছিটিয়ে চুল আচড়ে নিলাম ।
তারপর কাউগ্টারের সামনে গিয়ে তুললাম রিসিতার | মহেত্র
কৌশিক এখন অফিসে নেই-_বাইরে গেছেন। আজ আর ফেরার
সম্ভাবনা নেই। টেবিলে বসে এক গেলাস ত্র্যাণ্ডি ঢেলে দিলাম
গলায় | ফুটন্ত পদ্মফুলের মত মেয়েটিকে ইহজগতে আটকে
রাখার জন্তে আরও বেশি মনোবলের দরকার ছিল আমার । তা!
যখন নেই, তখন.*
আর এক গেলাস চাই। একবার তাঁকে জীবন দিয়েছিলাম ।
কিন্তু কই, সে জীবন তো ধরে রাখতে পারলাম না? আমার জন্তেই
ল্ে:*.
্র্যাপ্ডির দাম চুকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম । পাহাড়ে ওঠার মত
ক্লান্তি নেমেছে সারা অঙ্গে । ট্টিয়ারিং হুইলে হাত দিয়েই মনটা!
কিরকম হয়ে গেল। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এই হুইলেই হাত
দিয়েছিল সে। প্রেততত্ববিদদের মত যদি রুমাল বা খাম বা যে
কোন জিনিস ছু'য়েই অনেক কিছু জানা যেত ! কন্তরীর জীবনদীপ
নিতে যাওয়ার ঠিক আগের যন্ত্রণাময় মনটিকে জানার জন্য সর্বস্ব
দিতেও প্রস্তত আমি । না, না, একি ভাবছি? কোনো যন্ত্রণাই
পায় নি কন্তরী। জীবনের প্রতি নিলিপ্ততাই তার একমাত্র
গোপন রহস্ত । তাই তো এ জীবনকে পুরোনে। খোলসের মতই
ছেড়ে গেল সে। মাথা নিচের দিকে করে হাত ছুটো। ছদিকে
ছড়িয়ে দিয়ে লাফিয়েছিল ও, আলিঙ্গন করতে উদ্যত হয়েছিল সেই
ধরিত্রীকেই যে নির্মমভাবে ক্ষণপরেই প্রাণহীন করে দিয়েছিল তার
দেহবল্লরীকে | মনে হয় যেন, ও পালায় নি-*'অন্ত কোথাও গেছে...
ত্বগৃহে যাওয়ার মতই**"
এতটা ক্র্যা্ডি খাওয়! ঠিক হয় নি| একই চিন্তা বন্বন্ করছে
মাথার কোষে কোষে । এসে গেছে মহেন্দ্রের বাড়ি। ওই তো
কালে! গাঁড়িটা। ঠিক পেছনেই পার্ক করলাম। লাল মখমলের
ণ৪
কার্পেট মোড়। সাদ! মার্ধেলের সিঁড়ি পেরিয়ে গট গট করে উঠে
গেলাম ওপরে । তামার নেম প্লেটে ঝককমক করছে মহেন্দ্র
কৌশিকের নাম | কলিংবেলের বোতাম টিপে দিয়ে মাথা উচিয়ে
দাড়ালাম আমি।
_: কন্তরীর বাড়ি। বড় বড় টির অয়েলপেন্টিং বুলছিল
দেওয়ালে । অদ্ভুত ছবি। মানে বোঝ! ভার । উঠে গিয়ে ঈাড়ালাম
একটার নিচে। এককোণে নাম লেখা-কস্তরী। ওগুলো কি?
জানোয়ারের ছবি? কোন্ দেশের জন্তু এরা? আরেক জগতে
কম্তরীকে আহ্বান করে নিয়ে গেল কি এরাই? কোথায় দেখেছে
কম্তরী অত বড় কালো লেক? জলপন্প? দানবিক গাছের বুকে
কালে! কেউটের মত লতার রাজত্ব? আর একটা ছবিতে একজন
তরুণী মহিলার কণ্ঠে ঝুলছে একটা মণিহার। উমা দেবী। খোঁপা?
ঠিক কন্তরীর মত। মুখটা যেন আত্যস্তিক যন্ত্রণায় ঈষৎ বিকৃত-_
পলকহীন চোখে তাকিয়েছিলাম ছবিটার পানে--এমনি সময়ে খুলে
গেল পেছনের দরজ1।
“এসেছে! মহেন্দ্র গল।।
বে করে ঘুরে দীড়ালাম।
“এসেছেন উনি? .
“কে 1""'সে তো তুমিই জানো ?
ধপ করে বসে পড়লাম একটা ইজিচেয়ারে । উদ্ভ্রান্ত মনকে
মুখে ফুটিয়ে তোলার জন্যে কোন অতিনয়ই করতে হলে। না|
“আজ আমর! বেরোই নি.""চারট! পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম ।
তারপরেই গেলাম ঘোষপাড়া--যদি দেখা পাই। এই আশায়।
চীৎপুরের সেই হোটেলেই গেছিলাম."'সেখানে থেকেই আসছি
আমি'-'এখানেও যদি না থাকে-”
কাগজের মত সাদ! হয়ে গেল মহেন্দ্র । ঠেলে বেরিয়ে এল!চোখ
ছুটো। হা হয়ে গেল মুখটা |
৮৩
না, না-*"ছুর্ণভ' তোংলাতে থাকে মহেন্দ্র। “তুমি মিথ্যা
গালে হাত বুলিয়ে নিয়ে বললাম, “বিশ্বাস করে! । কোথাও
খুঁজতে বাকি রাখিনি আমি |,
“অসম্ভব ' "বুঝতে পারছে! না'"ঃ
কার্পেটের ওপর সজোরে লাখি মেরে ছুই হাত কচলাতে কচলাতে
ধপ করে একটা সোফায় বসে পড়লো মহেন্দ্র ।
খাবি খেতে খেতে বলল, “খুঁজে বার করতেই হবে"''এক্ষুনি--ষে
স্রীলোক যদি পালিয়ে যেতেই চায়, তখন তাকে বাধ না
দেওয়াই তালে। |
পালিয়ে যেতে চায়? পালিয়ে যেতে চায়? কন্তরী যেন
পালিয়ে যাওয়ার মেয়ে 1." "এতক্ষণে হয়তো সে-*”
লাফিয়ে দাড়িয়ে উঠলো মহেন্দ্র। ধাকা লেগে উল্টে গেল
কাশ্মিরী আতরদান বসানো! একটা! ছোট্র টেবিল ।
“কি করি বলে! তো, কি কর! উচিত এখন? তুমি তে। জানে!
এ অবস্থায় পড়লে কি করা দরকার? চুপ করে থেকে। না, দোহাই
তোমার, উত্তর দাও !
'সবাই হাসবে | ছু-তিনদিন পরেও ফিরে না এলে অবশ্ঠ
আলাদ। কথ,
কিন্তু তুমি বললে হাসবে না। তুমি উকিল মানুষ-*'
তাছাড়। ভুমি যদি বুঝিয়ে বলো সবাইকে যে আরও একবার
আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছিল কন্তরী। সেবার গঙ্গা থেকে
ওকে তুলে না আনলে কি যে হতো--.আজও হয়তো সেই
চেষ্টাই করেছে ও'.'তুমি বললে বিশ্বাস করবে সবাই.*-নিশ্চয়
করবে,"
কিস্সু করার দরকার নেই। এই তো ক'ঘণ্টা হলো বাইরে
৮৮১
গিয়েছেন উনি। রাত্রে খাবার আগেই আবার ফিরে আসবেন খন”
এ নিয়ে এত চিস্তা কি দরকার ?
যদি না আসে?
না এলেও তার অস্তর্ধানের বৃত্বাস্ত রিপোর্ট করাটা তো৷ আমার
ব্যবসা নয়।'
“অর্থাৎ তুমি সরে ধাড়াচ্ছে। ?
“ঠিক তা নয়--"একটু বুঝতে চেষ্টা করো-..পুলিসে স্বামীই খবর
দেবে- এইটাই কি স্বাভাবিক নয় ?
“বেশ এখুনি দিচ্ছি 1
মিছে লোক হাসাবে। ক'ঘণ্টা হলে। তোমার স্ত্রী বাড়ি ফেরেন
নি। তোমার এই কেস শুনে আর সামান্য এই প্রমাণ নিয়ে তারা
কোনো আকশনই নেবে না। যা! বলবে তাই লিখে নিয়ে সাফ
বলে দেবে; পাওয়া গেলেই খবর দেওয়। হবে। এর বেশি আর
কিছুই করবে না।'
আলগোছে বুকের ওপর দুহাত ভাজ করে রাখলে মহেন্দ্র |
“কিন্ত এইভাবে যদি নিক্ষর্মা হয়ে চুপচাপ বসে থাকতে হয়
আমাকে, তাহলে নির্ধাৎ পাগল হয়ে যাবো ।”
আবার পায়চারি গুরু করলো মহেন্দ্র । তারপর জানলার
সামনে পেতলের ঝকমকে টবে রাখা একগুচ্ছ গোলাপের পানে
তাকিয়ে রইল বিষঞ্ন চোখে ।
“এবার তো আমাকে উঠতে হয়।” বললাম আমি।
একটুও নড়লো ন৷ মহ্ে্দ্র। নিমেষে চোখে তাকিয়ে রইল
গোলাপগুচ্ছের পানে। সামান্ত একটা কাপন চকিতে জেগে উঠেই
মিলিয়ে গেল মুখের রেখায় রেখায় |
দরজার দিকে যেতে যেতে বললাম, “ফিরে এলে আমাকে (ফোনে
খবরটা দিও |;
আর নয়, এইবার যাওয়ার সময় হয়েছে । নিজের ফোখের
৮
ওপর আস্থা রাখতে পারছিলাম না! | নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম ন!
মুখের মাংসপেশীগুলোকে। মুখ-বন্ধ আগ্নেয়গিরির মতই নিষ্ঠুর
সত্য ফু'সে উঠে আসতে চাইছে ওপরে ।
চৌকাঠে পা দিয়ে পেছন কিরে তাকালাম । দুই করতলে মাথ!
গুজে পাথরের মত দীড়িয়েছিল মহেল্্র। আঙুলের ওপর ভর
দিয়ে হলঘরটা পেরিয়ে এলাম । সবচেয়ে কঠিন অংশটুকু ভাল
তাবেই শেষ কর গেছে। যবনিক। পড়েছে মহেন্দ্রর কেসে | এবার
ওর মানসিক যন্ত্রণ--.কিস্ত আমার যাতনা কি তার চাইতেও বেশি
নয়? অনেক বেশি! গাড়িতে বসে দড়াম করে দরজ। বন্ধ করে
দিলাম। প্রথম থেকেই কন্তরীর প্রকৃত স্বামীরূপে নিজেকে কল্পনা
করে এসেছি-_স্থতরাং আমার মনোবেদনা তো বেশি হবেই।
মহেন্দ্র তে! এতদিন জবরদখল করেছিল কন্তরীকে । কাজে-
কাজেই এ-হন নীচ ব্যক্তির জন্তে নিজেকে কি কেউ উৎসর্গ
করে? না, পুলিসে গিয়ে বলে যে, একদিন আমরা সহপাঠী
ছিলাম, বন্ধুর তরুণী ভার্ধার আত্মহত্যার সময়ে হাজির ছিলাম
অকুস্থলে_কিস্ত তাকে নিবৃত্ত করার সাহস আমার ছিল
না. এখন কোথাও চলে গেলেই ভাল ছিল। বাঁকুড়ার সেই
মকেলের কেসটি নিলে কলকাত৷ ছেড়ে কিছুদিন দূরে সরে যাওয়
যায়।
কিতাবে গাড়ি চালিয়ে গ্যারেজে গাড়ি তুলেছিলাম সেদিন, তা
জানি না। হঠাৎ চমকে উঠে দেখি, পা! টেনে-টেনে হাটছি আমি।
ব্টাক আউটের রাস্তা । হঠূলিপরা ল্যাম্পপোস্ট ; তারার আলোর
মত ফাকাশে আলো | বেশি রাত হলেই রাস্তাগুলো আজকাল
আরও জনহীন হয়ে যাচ্ছে । সকাল-সকাল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
দোকানগুলো । খাঁখা করছে মোড়গুলো। মাঝে মাঝে দেখ!
যায় সামরিক-যানের যাতায়াত। যুদ্ধের আতঙ্কে সত্যি-সত্যিই
মুড়ে পড়েছে শহরের আত্মা। আর, সবাই যেন যড়যন্ত্র করে
৮
বারবার আমার মনকে ঠেলে ঘুরিয়ে দিচ্ছে মৃতা কন্তরীর চিন্তায়।
সামনেই একটা রেস্তোরণ দেখে ঢুকে পড়লাম ।
“ওমলেট আর টোস্ট।,
কিছু খাওয়া দরকার । দুর্দিন আগেকার স্বাভাবিক জীবনে
আমাকে ফিরে যেতেই হবে। খিদে না পেলেও খেতে হবে।
পকেটে হাত দিতেই আয়না! আঙুলে ঠেকলো৷। সঙ্গে সঙ্গে সাদ!
টেবিল ক্লথ আর চোখের মাঝে যেন তেসে উঠল সেই মুখ-..কস্তরীর
সুখ ।
কলের পুতুলের মত চামচ দিয়ে ওমলেটটা কেটে কেটে মুখে
পুরতে লাগলাম | বৈরাগীর মত নিলিপ্ত হয়ে উঠেছি ইহসংসারের
সবকিছুর প্রতি। এখন থেকে কপর্দকহীনের মত জীবনযাপন
করবো শোঁকসাগরে নিমজ্জিত থাকব প্রতিটি মুহুর্ত; প্রায়শ্চিত্ত
করবো আমৃত্যু--এছাড়া আর পথ নেই। ঘ্বণার আগুনে তিল
তিল করে পুড়িয়ে মারতে হবে নিজেকে--যতদিন না আত্মসম্মানের
নতুন ক্কান অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে অন্ধকার জীবনে ।
রাস্তায় বেরিয়ে এলাম । আরও অন্ধকার হয়ে এসেছে শহর ।
বড় বড় বাড়ির ফাক দিয়ে দেখ! যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ তারার কোশনাই।
মাঝে মাঝে সা করে. বেরিয়ে যাচ্ছে একটা মোটর, মিলিটারী
সাজোয়া গাড়ি-_হেড লাইটগুলোকেই ঠুলি পরিয়ে রেখেছে
বোমার ভয়ে । মন স্থির করে উঠতে পারলাম ন! বাড়ি যাব কিন1।
তয় টেলিফোন যন্ত্রটাকে__ঝনঝন করে বেজে উঠে নিয়ে আসবে
সেই ভয়ঙ্কর সংবাদ--লাশ পাওয়। গেছে! তাছাড়া যে-দেহের
অক্ষমতার জন্যে কন্তরীর প্রাণবিয়োগ ঘটল, সে দেহকে ক্লাস্তিদেহে
আরও কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখতে চাই। বাম্পাচ্ছন্ন চোখে ক্ষিপ্তের
মত এলোমেলো তাবে এদিকে-ওদিকে করলাম কিছুক্ষণ | ; তোর
না হওয়া পর্ধস্ত এই” ভাবেই নির্যাতিত হোক অপটু দেহ। কম্বরী!
কস্তরী! হতভাগিনী কন্তরী ]
৮৪
অশ্রু এবার আর বাধা মানল না| উপচে উঠে গড়িয়ে পড়ল
চোখের কোল বেয়ে। জলের ধার! মুছলাম না। কাদলে মনটা
অনেকটা লঘু হয়ে যায়। বুকের অসহা অবর্ণনীয় টনটনে ব্যথাটা
একটু যেন ফিকে হয়ে আসে | জমাট বাঁধা! বেদনাটাই যেন গলে
গলে অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসছে । আন্মক| সামনে ও কিসের
জল? গঙ্গা! ওই বেঞ্িটায় একটু বসা যাক | বড় ঠাণ্ডা পড়েছে।
তাতে কি? মাথাটা ঝিমঝিম করছে । চোখ জুড়ে আসছে ।
ওই সেই গঙ্গা... যেখানে. -কম্তরী...আয়না ..
তোর বেলা হি-হি করে কাপতে কাপতে উঠে বসলাম। ডান
পায়ের শিরা টেনে ধরছে দারুণ ঠাণ্ডায় । রাস্তায় নেমে এসে
একভাড় চা খেয়ে রওনা হলাম বাড়ির দিকে ।
দরজা বন্ধ করতে-না-করতেই বেজে উঠল টেলিফোনের ঘণ্টা।
হ্যালো! কে, হর্লত ?
হ্যা।
“যা ভয় করেছিলাম, কন্তরী আত্মহত্যা করেছে ।,
কিছু না বলাই ভালো | প্রায় দমবন্ধ করে ধ্াড়িয়ে রইলাম
আমি।
“কালকেই খবর পেলাম। একটা বুরুজের নীচে ওর লাশ
দেখতে পেয়েছে একজন বুড়ি |;
“বুরুজ ? কোথায় ?
শ্যামনগরের কাছে ভাঙ। নীলকুঠির বুরুজ-..
“ওখানে কি করতে গেছলেন উনি ?
ুরুজের চুড়ো৷ থেকে নীচের উঠোনে লাফিয়ে পড়েছিল কন্তরী ।
ডেডবডি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
“কি শোচনীয় মৃত্যু! তুমি যাচ্ছে! নাকি ?
এইমাত্র ফিরলাম আমি । খবর পেয়েই ছুটেছিলাম | তোমাকেও
সঙ্গে নিতে চেয়েছিলাম-_কিস্তু বাড়িতে ছিলে ন! তুমি । কিছু
৮৫
জরুরী কাজ ছিল বলে কলকাতায় এসেছি-_এখুনি আবার ফিরে
যাচ্ছি। পুলিস তদস্ত শুরু করে দিয়েছে।'
তা তো করবেই। যদিও এন-মৃত্যু সুইসাইড ছাড় আর
কিছুই নয় |,
কয়েকটা গোলমেলে ব্যাপার দেখে মাথ। গুলিয়ে গেছে
পুলিশের! যেমন ধরো, সুইসাইডই যদি করতে হয়, এতদুরে
আসার দরকারটা কি! কি যে ছাই বলি আমি, বুঝতে পারছি
না। ওদেরকে এ-কথাটাও আমি জানাতে চাই না যে কন্তরী'-.;
“অতদূর ওর! এগোবেই না।
“যাই হোক, আমার সঙ্গে তৃমি থাকলে স্বস্তি পেতাম ।”
যাওয়ার তে। এখন প্রশ্নই ওঠে না, কেননা একটা জরুরী
মোকদ্দমার বাপারে বাকুড়। যেতে হচ্ছে আমাকে ।'
“অনেকদিন লাগবে নাকি ?
না, না, দিন ছয়েকের ব্যাপার । তাছাড়া আমাকে তোমার
দরকারই হবে না”
“আবার ফোন করব 'খন। জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে নিতে
বলল মহেন্দ্র-_ঠিক যেন হাপাচ্ছে।
লাইন কেটে দিলাম । দেওয়ালের ধরে টলতে টলতে বিছানার
ওপর গিয়ে শুয়ে পড়লাম চিৎ হয়ে। নিশ্বীস নিতেও কষ্ট হচ্ছে
আমার।
একটু পরেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল ক্ষতবিক্ষত
চেতন] | ৰ
সেই দিনই বীকুড়ার রওন! হয়েছিলাম । ছুটস্ত ট্রেনের তালে তালে
মন ছুটে গেছিল শ্যামনগরের নীলকুঠির সেই প্রাঙ্গণে । উঁচু ঝুরুজের
সামনে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ-_তার ওপরে পড়ে একটি রক্তাক্ত মাংস."
পুলিস নিশ্চয় পোস্টম্টেষষ করে আরও কদাকার তয়াব্হ্ করে
তুলেছে সেই অপরূপ তন্বী দেহটিকে। কতদুর এগোলো৷ তদন্ত ?
৮৬
যুদ্ধের এই ডামাডোলের মধ্যে আসল রহম্তের সন্ধান কি পাওয়।
যাবে?
বাকুড়ার হোটেলে আস্তানা নিয়েছিলাম । পরের দিন কাগজ
খুলে খুঁজেছিলাম খবরটা । ভেতরের পৃষ্ঠায় এককোণায় বেরিয়েছিল
মাত্র কটি লাইন। বড় বড় যুদ্ধের ছবি আর খবরের তিড়ে প্রায়
হারিয়ে যেতে বসেছিল লাইন ক'টি। পুলিস তদন্ত চালাচ্ছে ।
তাদের সন্দেহ এ মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। মহেন্দ্র নিশ্চয় নাজেহাল
হচ্ছে পুলিসের জেরার সামনে । আর ক'টা দিন। তারপরেই ফিরে
গিয়ে ভেবে দেখবে! । পুলিসের সামনে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে
মহেন্দ্রকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করবো কিনা, তা তেবে দেখবে
কলকাতায় ফেরার পর।
কিন্ত সে স্বযোগ আর এল না। ছুদ্দিন পরেই জাপানীর। বোম!
ফেলল কলকাতায় । কিরকম যেন হয়ে গেলাম । কলকাতায় ফিরে
এসে সামান্য কটি স্ুটকেস নিয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে আবার পা! বাড়ালাম
কলকাতার বাইরে | ঘুণাক্ষরেও তখন জানতে পারিনি, প্রবাসেই
অতিবাহিত হবে এতগুলি বছব। ঘটনার পাকেচক্রে এমন জড়িয়ে
পড়লাম যে দীর্ঘ চারটি বছর হারিয়ে গেল কালের গর্ভে কলকাতায়
ফেরার কোনো স্থযোগই পেলাম না।:'"
৮৭
দ্বিতীস্ত খণ্ড
| এক ॥
স্বাস নিন. 'জোরে'*'কাশুন**'আর একবার শ্বাস নিন-'ফাইন-..
এবার হাট! দেখ! যাক...নিশ্বেস ধরে রাখুন, ছাড়বেন না...হুম !
খুব ভাল দেখছি না--.ঠিক আছে, জামা-কাপড় পরে নিন-**
ডাক্তারের তীক্ষদৃষ্টির সামনে থেকে চোরের মত সরে গিয়ে
সার্টট। গায়ে চাপালাম আমি ।
"বিয়ে করেছেন ?'
“না--.এই তো ফিরলাম বন্ধে থেকে ।,
পকি করতেন সেখানে ?
'অনেকরকম কাজ । কিছুদিন সেল্স্ম্যান ছিলাম একট!
ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীতে । ভাল লাগল না সে কাজ-'"তাই *”
এবার কি কলকাতাতেই থাকবেন ?
“ঠিক জানি না । আগে এখানেই প্র্যাকটিস করতাম । কিন্তু
এখন যে কি করব, তাই জানি ন1।”
“কিসের প্র্যাকটিস ?
“আইনের 1,
“তাহলে থেকে যান। প্র্যাকটিস জমতে কতদিনই বা যাবে।
“একটা ফ্ল্যাট তো৷ দরকার | আগের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখলাম
সেখানে একটা পাঞ্জাবী ফ্যামিলি রয়েছে । জানেন তো এখন বাষ৷
পাওয়া কি মুশকিল 1
কান চুলকোতে চুলকোতে ভাক্তারবাবু গুধোলেন, “আপনি মদ
খান ?
“তা খাই। জীবনে অনেক চোট খেয়েছি তো ।,
টেবিলে বসে পড়ে ফাউণ্টেন পেনের ক্যাপ খুলতে খুলতে
বললেন ভাক্তার, 'আপনার স্বাস্থ্য মোটেই ভাল দেখছি না। প্রচুর
বিশ্রাম দরকার আপনার | সমুদ্রতীরে মাসখানেক থাকতে পারলে
খুবই ভালে! হয় “*আর আবোলতাবোল চিন্তা আর স্বপ্ন সম্বন্ধে যা
বললেন- সে ব্যাপারে আমার করণীয় কিছু নেই। আমি লিখে
দিচ্ছি- আপনি ডক্টর মল্লিকের সাথে দেখা করুন-_এ বিষয়ে উনি
স্পেশালিস্ট |,
“যা বললেন, তা কি সত্যই খুব সিরিয়াস । ভয়ে ভয়ে
শুধোই |
ক্কুর মলিকের সাথে দেখ! করুন ।১
খসখস করে প্যাডের ওপর কলম চাঁলালেন ভাক্তার।
'আনশার এখন দরকার ভালো খাওয়া, পুরো বিশ্রাম, আর উদ্ভট
চিন্তা থেকে মাথাকে একদম রেহাই দেওয়া | চিঠিপত্র লেখাও বন্ধ
রাখুন। পড়াশুনাও তাই 1.*"আট টাকা...থ্যাংক ইউ ।'
বিড়বিড করতে করতে সি'ড়ি বেয়ে নমে এলাম | স্পেশালিস্ট !
সাইকিয়াট্রস্ট ! সব রহমত জেনে নিয়ে কন্তরীর মৃত্যু সম্বন্ধেও কথা
বলতে বাধ্য করবে আমাকে । পাগল আর কি! তার চাইতে বরং
সারা জীবন এই ছুস্প্প নিয়েই থাকবো । তবুও সাইকিয়াট্রিস্টের
কাছে মনের দরজ। খুলতে যাবে নী। বোম্বাইতে এই কটা। বছর
উচ্ছংজ্ঘল জীবন যাপন করেছি । শরীর তেঙেছে সেই কারণেই ।
এখন আর কোনো! তয় নেই।
কলকাতাকে যেন আর চেনাই যায় না। অনেক পালটেছে এই
ক'বছরের মধ্যে । ম্যাডান স্ত্রীটের বারে ঢুকে একটা নিরাল।
টেবিলে বসে পড়লাম |
পর-পর ছু-পেগ ব্র্যাণ্ডি গল! দিয়ে নামিয়ে একটু ধাতস্থ মনে
হলে। নিজেকে । আরও এক গেলাস রেখে গেছে সামনে | উলটলে
৮৪১
প্রেত-প্রের়সী--৬
হলুদ স্থরা। মনের আধারে সুপ্ত প্রেতদের যে জাগিয়ে তুলতে
অদ্বিতীয়। না, কন্তরী মরে নি। প্ল্যাটফর্মে পা দেওয়ার পর
থেকেই কন্তরী সঙ্গ নিয়েছে আমার । অনেক মুখই মানুষ ভুলে যায়।
পাথরে খোদাই মুতিও রোদে জলে ক্ষয়ে যায়। কিন্তু কম্তরীর মুখ
কোনোদিন ভোল। যাবে না। প্রাণচঞ্চল স্ষুতিতে উচ্ছল অপরূপ
রূপসী তন্বী দেহকে আবার চোখের সামনে দেখতে পেলাম*" ছলছল
করে জল বয়ে চলেছে গঙ্গায়...ঝুঁকে পড়েছে কস্তবরী."'টুকরে।
টুকরো হয়ে উড়ে গেল চিঠিটা...
এক ঢে।কে নিঃশেষ করে দিলাম গেলাসটা |
“ওয়েটার ! আর একটা ।'
মদ আমার ভাল লাগে না "কিন্ত মদ ছাড়া ইদানীং থ।কাও
যাচ্ছে ন7া। কলকাতায় নেমেই মহেল্ব খোঁজ নিয়েছিলাম ।
মহেন্দ্র মার গেছে মোটর ছর্ঘটনায়। ক্তরীব মৃত্যুর কিছু পরেই ।
দূর সম্পর্কের এক ভাই আস্তানা নিয়েছে তাঁর প্রাসাদ তুল্য ভবনে ।
কিন্তু তবুও স্বস্তি পাচ্ছি কই? তুষের আগুনের মত সেই
জবলুনিটা...
কপাল ভালো । বাইরে পা দিয়েই ট্যাক্সিটা পাওয়া গেল।
অনেক দূরে যাবো | হ্থ্যা, শ্ামনগব | সেই টাওয়ার" 'সেই চহব*'
সেই তাা নীলকুঠি-. যেন চুম্বকের মত টানছে আমাকে'**
হলুদ রঙের ধূ-ধু সরষেব ক্ষেতের অপরূপ সুষমা, পথের ছুধারে
অজভ্র হাড়মটমটি গাছের লাইলাক রঙের ফুলের বন্য সৌন্দর্যেও দৃষ্টি
ছিল না আমার। পুরোনো সেই চত্বরটাব সামনে এসে হঠাৎ বুকটা
মোচড় দিয়ে উঠল। ওই তো বুকজ। বুকজের ওপর থেকে
যে কুঁড়ে ঘরগুলো লক্ষ্য করেছিলাম, তাঁরই একটার দিকে
এগিয়ে গেলাম পায়ে পায়ে। নায়ুগুলে। অস্থির হয়ে উঠেছে।
নার্ভাসনেস ।
মুদ্রীর দোকান । আধবুড়ে। মুদ্রী আমাকে দেখে একটু অবাকই
হলো।
“কি দেব বলুন ?
আমতা অ।মতা৷ করে বলি, “এসেছিলাম বুরুজটা দেখতে । তাই
ভাবলাম আপনার সঙ্গে পীচ মিনিট গল্প করে যাই ।,
গায়ের মানুষ শহরের বাবুর যুখে মাঁপনি সম্বোধন শুনে খুশিই
হলো । খাতির করে নড়বড়ে বেঞ্িতে বসিয়ে তক্ষুনি এক ভাড়
চায়ের অদ্ডারও দিয়ে দিলে । একথাসেকথার পর শুধোলাম,
“আচ্ছা, কয়েক বছর আগে কাগজে পড়েছিলাম কে যেন আত্মহত্যা!
কবেছিল এখানে £
'হ্যা, হ্যা, একট মেয়ে বুরুজ থেকে লাফিয়ে পড়েছিল 1,
“মনে পঠেছে-কলকাভার একজন মস্ত ব্যবসাদারের বউ।
তাই নং?
যা, নামটা মনে নেই | লাশটা বুড়িব চোখে পড়ার পর আমিই
পুলিশে খবর দিয়েছিলাম | তাব ঝন্কিও কম পোয়াতে হয় নি। তবে
কেউ কেউ বলে মেয়েটাকে নাকি ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে 1
“ঠেলে দেওয়। হয়েছে? মাথ! ঘুরে ওঠে আমার |
হ্যা, একজন বুড়ো একট। গাড়ি যেতে দোখেছিল । গাড়িতে
ছিল একজন মেয়োলোক, আর একজন ভদ্দরলেো।ক 1,
রুদ্ধ নিশ্ব(সট। ত্যাগ কবলাম। কম্তবী আর আমাকেই যেতে
দেখেছে বুড়ো অর্থাৎ খুনী হিসাবে আমাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে
দেওয়ার জন্তে একজন সাক্ষী অন্তত হাজির বয়েছে এ গ্রামে । অবশ্য
সে বুড়ো এখন বেঁচে আছে কিন। ভগবান জানেন | তবুও সাবধানেৰ
মার নেই | এ জায়গা ছেড়ে এবার সবে পড়াই ভালো ।
আরও ছুচার কথার পর উঠে পড়লাম । মাথাটা ঝিমঝিম
করছে উত্তেজনায় । ব্র্যাপ্ডির প্রতিক্রিয়।ও হতে পারে |
ট্যাক্সি ফিরে এল কলকাতায়।
৪১০
মনের সঙ্গে অনেক লড়াই করেও ড্র মল্লিকের কাছে না গিয়ে
পারলাম না| সব কথাই খুলে বললাম--কিছু কিছু অবশ্ঠ বাদ
দিয়ে। মহেন্দ্র নাম একেবারেই উল্লেখ করলাম না; পুলিসের
সন্দেহের কথাও চেপে গেলাম। বলতে বলতে বার কয়েক ঝরঝর
করে কেদেও ফেললাম ।
শুনে সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, “তাহলে এখনও আপনি
তদ্রমহিলাকে দেখার আশা রাখছেন | আপনি বিশ্বাস করেন ন'
যে, তিনি মৃত ?
“বিশ্বাসের প্রশ্ব নয়, ডক্টর । এ যে আমি নিজের কানে শুনেছি,
স্বচক্ষে, দেখেছি ।”
“যাই দেখে থাকুন অথবা শুনে থাকুন না কেন, সারকখা এই--
আপনি বিশ্বাস করেন কন্তরী বেঁচে থাকতে পারে এই কারণে যে,
মৃত্যুর পরেও তাকে একবার বেঁচে উঠতে দেখা গেছে ।,
“ঠিক ওইভাবে অবশ্য আমি বলতে
“অন্ত কিছুভাবেও বলেন নি আপনি। পক্ষান্তরে, নিজের
অজ্ঞাতসারে এমন সব কথ। বলছেন, যাতে সমস্ত জিনিসটাই বেশ
ঘুলিয়ে ওঠে । নিন, ওই কৌচটায় শুয়ে পড়ুন দিকি ।'
বেশ কিছুক্ষণ" ধরে রিফ্লেক্স পরীক্ষা করলেন ডক্টুর। তারপর
কপাল কুঁচকে বললেন, “আগে মদ খেতেন?
থুব বেশি নয় ; নেশ। ছিল নাঁ_-এখন নেশায় দাড়িয়েছে ।'
“আর কোন মাদক দ্রব্য ?
'না।
“সত্যি সত্যিই সেরে উঠতে চান কিনা ভাবছি আমি |,
সেই জন্তেই তো এলাম আপনার কাছে।,
“তা যদ্দি চান তে মদ খাওয়া বন্ধ করতে হবে ; মন থেকে এই
মেয়েটিকে নির্বাসন দিতে হবে । মনকে এই কথাই বিশ্বাস করাতে
হবে যে, সে মরে গেছে_ একেবারেই মরেছে-আর বেঁচে উঠবে
৩
না। বুঝেছেন তোস্থায়ী মৃত্যু-'-কিন্ত তার আগে আর একবার
জিজ্দেস করে নিই, সত্যি সত্যিই সেরে উঠতে চান কিনা বলুন 1,
“কি বলছেন ডক্টর? কি করে যেবিশ্বাস করাই আপনাকে."
“ঠিক আছে, ঠিক আছে । তাহলে শুরু হল আপনার চিকিৎসা! ।
পুরীতে আমার বন্ধুর বাড়ি আছে...সমুদ্রের ধরেই স্বর্গদ্ধারে-_চিঠি
দিচ্ছি আপনাকে ।'
ঢোক গিলে বলি, “তাহলে পাগলা গারদে থাকার দরকার
নেই ?
হেসে উঠলেন ডক্টর ।
না, না, সেরকম সিরিয়াস কিছু হয় নি। পুরীতে যেতে
বলছি কেবল সেখানকাবৰ জল-হ।ওয়াব জন্যে । কাছে টাকী আছে
তো ?
“অ12।
'ভাগে থেকেই জানিয়ে বাখি, এ ঠিকিৎস। ছু-দিনে শেষ হবে
না।'
যতদিন লাঞ্চক, আমি রাজি আছি।'
প| টনটন করছিল, তাই বসে পড়লাম সামনের চেয়ারে।
ডাক্তারের কোন কথায় আর কান ছিল না; একই কথাকে ঘুরিয়ে
ফিরিয়ে বারবার আরুন্তি করে চলেছিলাম মনে মনে £ আমি সেরে
উঠতে চাই" সেরে উঠতে চাই".
চিকিংসার শুরু থেকেই একটু একটু করে অনুশোচনা দান।
বেধে উঠতে লাগল মনের মধো। এ অনুশোচনা কম্তবীকে
তালবাসার'*'ভাল না বালে তো এতাবে কষ্ট পেতে হত ন৷
আমাকে | আবার নতুন করে শুর হোক আমার জীবনযাপন,
নতুন উদ্যম নিয়ে । অস্পষ্ট হয়ে যাক পুরোন। পৃষ্ঠাগুলো-_তাহলেই
আবার ভালবাসতে পারবে আর কাউকে-- আর সবার মতই স্থুখে
ঘর বাধতে পারবো. তখনও উপদেশবধণ করে চলেছিলেন
৭৯৩
ডক্টর । সব-কিছুতেই সায় দিয়ে চলেছিলাম, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলাম
সব নির্দেশেই | হ্যা, আগামী কালই রওন৷ হবে পুরীতে । মদ
খাওয়াও বন্ধ করবো । পুবে। বিশ্রাম নেবো | রাঁজি-''রাঁজি'""
রাজি--সমস্ততে র।জি *'
ট্যাক্সি ডেকে দেবো? ভক্টরেব আসিস্ট্যান্ট জিজ্গেস
করলেন আমাকে ।
না; একটু হাঁটলে মনটা তাল থাকবে ।'
প্রথমেই বুকিংঅফিসে গিয়ে আগামী কালের টিকিট কাটলাম।
তারপর ব্যাঙ্ক আর হোটেল । হাতে এখনও অনেকটা সময় রয়েছে।
সিনেমায় ঢুকে পড়লাম ছবি দেখাব চাইতে সময় কাটানোই
আমার মুখ্য উদ্দেশ্য । আ'বও উদ্দেশ্য আছে- ডক্লীব মল্লিকের
প্রশ্রগুলোকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।ম আমি । কোনদিন
ঘুণাক্ষরেও কি ভেবেছি, পাগল হতে হবে আমাকে? তাই দাকণ
তয় সাপের মত পেঁগিয়ে ধরেছিল মনটাকে । স্নাধুগ্ুলোও 'খন
থেকে স্থির নেই। হাত-পা সবই যেন কাপছে । একটু ব্রাপ্ডি পেলে
ভাল হতো । পরক্ষণেই দাতে দাত পিষে গালি দিয়ে উঠলাম নিজে
তুর্বলতাঁকে |
আলোকিত হয়ে উঠল রূপোলি পর্ধী। প্রথমেই খবর-কটকের
দৃশ্য £ জনতার ভিড় ঠেলে মহাস্সা গান্ধী এগিয়ে চলেছেন মঞ্চের
দিকে ; চরক। আকা পতাকা, লালপাগড়ি আর অজত্্ উৎসুক মুখ ।
আমারও কাছে এগিয়ে এল ক্যামের।-জনতা জরধ্বনি করছে-* কিন্ত
শব শোন। যাচ্ছে না; হাত নাড়ছে একজন মোটা লোক ধীরে ধীবে
ক্যামেরার লেন্সের দিকে ফিরে ঈড়াল একজন স্ত্রীলোক ফ্যাকাশে
চোখ--'কিন্ত দেহরেখ! দেখে পটে আকা ছবির কথা মনে পড়ে যায়।
এগিয়ে গেল ক্যামেরা."'কিন্ত ওইটুকু সময়ের মধ্যেই চিনতে
পেরেছিলাম'"'চেয়ার ছেড়ে অর্ধেক উঠে তয়ার্ত চোখে তাকিয়ে
রইলাম পর্দার পানে।
১১০০]
পেছনের সারি থেকে চেঁচিয়ে উঠল একজন, “বসে পড়ুন, বসে
পড়ুন!?
হু"হাতে তখন নিজের গ'ল খামচে ধরেছি আমি-অবকদ্ধ
আর্ত-চিংকারে ফেটে পড়তে চাইছে বুকের খাঁচ।টা | শুন্য দৃষ্টি
মেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম পর্দার জনতার পানে,
গান্ীজীর এগিয়ে চল! মৃত্তির পানে । তারপরেই একটা হ্যাচক।
টানে বসে পড়লাম সিটে ।
৪৫
॥ ছুই ॥
না, কন্তরী নয়'**তক্ষুনি উঠে গিয়ে পরের শোঁর একট! টিকিট
কিনে আনলাম। শে! শেষ হয়ে যাওয়ার পর উঠে গেলাম নতুন
সিটে। পরের শো-র শুকতেই নিউজ-রীল-_-উত্তেজনায় ধক্ধক্
করছিল বুকটা। যে যুখ দেখার জন্তে এই প্রতীক্ষা, তাকে এবার
শুধু দেখা নয়, মনের পটে মুদ্রিত করে রাখতে চেয়েছিলাম আমি |
তাই ওই ছু-এক সেকেণ্ডের মধ্যেই যতটা! সম্ভব দেখে নিয়েছিলাম ।
বছর তিরিশ বয়স মেয়েটির ; খুব ছিপছিপে নয়। মুখট। হুবহু
সেরকম নয়-_-তবুও বিস্ময়কর সেই সাদৃশ্য | বিশেষ করে চোখ
ছুটি তে! অবিকল তারই মত। মনের সমস্ত শক্তি এক করে
স্মৃতিতে আকা মুখটির সঙ্গে পর্দায় দেখা মুখটি মিলিয়ে দেখতে
চেষ্টা করলাম | কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছিটিয়ে পড়া কিছু কিছু রঙ
ছাড়া আর রইল না কিছুই--জোরালো আলোয় চোখ ধাধিয়ে
গেলে মেমন হয়, ঠিক তেমনি।
পনের দিন পুরী" যাওয়া বাতিল করলাম। ম্যাটিনী শোতে
গিয়ে আর একবার দেখে এলাম সেই মুখ । এবার আরও খুঁটিয়ে
**“দ্বিতীয় ব্যক্তিটিকে চোখে পড়ল তখনই | মেয়েটির ঠিক পেছনেই
দাড়িয়ে একজন সুবেশ পুরুষ | পবনে বিলিতি পোশাক | স্ুদৃশ্ঠ
পিন দিয়ে আটকানো নেকটাই । আলগোছে মেয়েটির হাত
ধরেছিল সে। মেয়েটির গায়ে আলস্টার, ফারের কলার।
রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। আনমনে হাটতে হাঠতে মনে পড়ল
আরও অনেক কিছু । ভিড়ের ওপর দেখা যাচ্ছিল একটা মস্ত
সাইনবোর্ড--হোটেল কসমোপলিটান। অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল
নামটা, তবুও নজর এন্ডায় নি আমার । খুব সম্ভব হোটেলে ভেরা
৪৬
নিয়েছিল ছুজনে--শোভাযাত্রা দেখে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল
ক্যামেরার সামনে ।
হাসি পেল। এক সময়ে গোয়েন্দাগিরি কবেছি বলে কি
এখনও এই জামানত দৃশ্য থেকে এত কিছু ভাবতে হবে ?
সামনেই বার। সামলাতে পারলাম না; একটা হুইস্কি শেষ
করে আর একটার অর্ডার দিয়ে ঝিম মেরে বসে রইলাম কিছুক্ষণ ।
ত্রাণ্ডিতে আর শানায় না| হুইস্কি অনেক তাঁলো-অনেক
তেজালো । স্সাযুর হুবলতা! চকিতে মুছে দিতে অদ্বিতীয় | ছুই মুখের
আদল এক হতে পারে, কিন্তু তাতে কি? যা শেষ হয়ে গেছে,
তা নিয়ে আবার ভাবা কেন? শ্দুধ কটক শহরে হুবহু তারই মত
দেখতে একটি মেয়েকে নিয়ে সুখে ঘব বেঁধেছে একজন পুকষ--তা৷
দেখে কেন এই অব্যক্ত বেদনায় ছটফটিয়ে মরব আমি? না, আব
কোন দ্বিধা নয়, হুর্বলতা নয়। কালই পুরী রওনা হবো । সমুদ্রের
হাওয়ায় শরীরের সাথে সাথে মনটাকেও চাঙ্গা করে তুলতে হবে।
ঠিরতবে স্তন্ধ করতে হবে এই দুঃসহ স্মতির রোমন্থন |
পবদিন যথাসময়ে রওনা হয়েও কিন্তু পুবী পৌছোনো আর হল
না। কটকে পৌছেই হঠাৎ নুটকেস নিয়ে স্টেশনে নেমে পড়লাম |
মনেব সঙ্গে অনেক লড়াই কবেও শেষ পর্যন্ত আর সামলাতে
পাবলাম না। একট! দিন কটকে থেকে গেলে ক্ষতি কি?
স্টেশন থেকে সিধে হোটেল কসমোপলিটান | ঘর একখান।
আছে বটে, তবে রেট বেশি । লাগোয়া বাথরুম | কুছ পবোয়া
নেহি। এরকম উদত্রান্ত অস্থিব অবস্থায় একটু বিলাসিতাই পছন্দ
কবছিলাম আমি ।
গাদ্ধিজী কবে এসেছিলেন এখানে ? কথায় কথায় হঠাৎ
ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করি আমি |
“তা প্রায় মাসখানেক আগে তো বটেই |
৪৯৭
মাসখানেক ! অনেকগুলে। দিন কেটে গেছে এর মধ্যে !
স্থুটপরা! মাঝবয়েসী এক ভদ্রলোক উঠেছিলেন এখানে £
টাইপিন লাগাঁতেন নেকটাইতে ?
নিতান্ত বোকার মত প্রশ্ন শুনে ম্যানেজার মনে মনে হাসলেন
কিনা বোঝা গেল না, মুখে বললেন, “ত। তো বল। মুশকিল | ওরকম
তো কত লোকই আসছে-যাচ্ছে ।'
তা তো! বটেই। কিন্তু কার আশায় এতদূর ছুটে এসেছি আমি?
বিকৃত কল্পনাকে এভাবে প্রশ্রয় দিয়ে কোন লাভ আছে কি? কিন্ত
না। আর বিতর্ক নয়। একটু গড়িয়ে নেওয়া যাক। কালকের
সারাদিনট। তো রয়েছেই ।
সকালে উঠে দাড়ি কামিয়ে সান করে নিলাম। নেমে এলাম
খাবার ঘরে | বেশ বড় হোটেল । বার রয়েছে একদিকে | গুপাশে
রেস্তোরণ1। ব্রেকফাস্ট সামনে নিয়ে বসে রয়েছে স্বদেশী বিদেশী
কত যুগ্ম মৃতি। আমিই বোধ হয় একমাত্র ব্যক্তি, যার সঙ্গী নেই।
ওদিকের টেবিলে চোখে পড়ল একজন মোটা লোককে “স্বপ্ন দেখছি
নাকি আমি 1." 'নেকটাইতে টাইপিন "'
জয় ভগবান! এ্রেইকি সেই? বছর পঞ্চাশ বয়স, পরিপাটি
বেশ। সামনের চেয়ারে-বসা তরুণীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে
ওমলেট খাচ্ছিলেন ভদ্রলোক | মেয়েটি আমার দিকে পেছন ফিরে
বসেছিল, মুখ দেখা যাচ্ছিল না। একমাথা কুচকুচে কালো চুল।
আলস্টারের ফারকলারে ঢাকা পড়ে গেছে খোপার খানিকটা | মুখ
দেখতে হলে হলের ওদিকে যেতে হবে-"'যাবো | একটু পরেই যাবো।
এই মুহুর্তে আবার অসংযত হয়ে উঠেছে ন্নায়ুগ্ুলো। আঙুল কীপছে।
কাপাঁ আঙুলেই একটা সিগারেট তুলে নিয়ে পরক্ষণেই যথাস্থানে
রেখে দিলাম | ব্রেকফাস্টের আগে সিগারেট খাবো না।
চেষ্টা করে স্বাভাবিক গলায় কাউণ্টারের ওয়েটারকে শুধোলাম,
৪১৮
“ওই যে ভদ্রলোক " মাথার সামনের দিকে টাক পড়েছে." সামনে
বসে ওই যে আলস্টার গায়ে তদ্রমহিলা-""গদের নাম কি ?
ভদ্রলোকের নাম নিশিকান্ত শর্মা |:
“নিশিকান্ত শর্মী1.""কি করেন ?
“কি করেন না বলুন? চাকরি বাদে এমন কিছু নেই যা করেন
না। টাকার কুমীর।'
উনি ওর স্ত্রী?
“উহু, কোন মেয়েকেই বেশিদিন সহা করতে পারেন ন! উনি ।,
'বটে। টাইমটেবলট! আছে নাকি ? --ঠিক আছে?
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে টাইমটেবলের পাতা ওল্টাতে
লাগলাম। কিন্তু চোখ রইল সামনে । মেয়েটি সামান্য ঘুরে বসেছে ।
আরও ভালভাবে দেখা যাচ্ছে মুখশ্রী। আচন্থিতে লাফিয়ে ওঠে
হৃদযন্ত্রটা | কন্তরী! মনকে যে আর চোখ ঠাউরানে যাচ্ছে না।
অনেক পাল্টে গেছে ও। আগের চাইতে মুখট৷ একটু তারি হয়েছে।
মুখের সে কাচা তাবটিও আর তেমন নেই। এ আর এক কস্করী-*.
কিন্তু সেই কন্তরীই বটে |. হুবহু এক!
আস্তে আস্তে চেয়াবে এলিয়ে পড়ি আমি। পকেট থেকে
রুমল বার করে কপালের ঘামটুকু মুছে নেওয়ার শক্তিও যেন নেই
আমার। হঠাৎ প্রচণ্ড আলোর ঝলকানিতে চিন্তাধারা যেন
থমকে দীড়িয়ে গেছে। কিছু আব তাবতে পাবছি নী । চোখ
বুজেও কস্তরীর মৃত্তিকে মুছে ফেলতে পারিনি মগ্জিফষের প্রতিটি
বেদনাময় কোষ থেকে ।
স্ত্রী! কম্তরী ! কস্তরী ! ঠক্ করে হাত থেকে টাইমটে বলট।
পড়ে গেল মেঝের ওপর ।
অনেক চেষ্টায় অনেকক্ষণ পরে সামলে নিলাম নিজেকে । ধীরে
ধীরে চোখ খুললাম | না, কন্তরীর মত নয়--তবুও কন্তরীই বটে।
কিন্তু এতট। নিশ্চিত হচ্ছি কি কারণে | সামনেই সুবেশ পুরুষটির
৪৪
সামনে ওই যে সুন্দরী, সে যে কস্তরীই-_-সে বিষয়ে কোন সন্দেহ
থাকতে পারে না। স্বপ্ধ নয়, সত্য । আমি যেমন স্বপ্ন নয়, সামনের
ওই রহস্তময়ী নারীটিও তেমনি স্বপ্র নয়। একি নিষ্ঠুর সত্য? সত্য
কি এত বেদনাদায়ক হয়? ওই সত্যকে মেনে নিই কি করে?
নিজের চোখে দেখেছি যে তাকে মরতে ?
কস্তরী মৃতা। কিন্তু কম্তুরী জীবিতা। ওই সেই কন্তরী ৷
মেয়েটির হ'ত ধরে উঠে দাড়িয়েছে নিশিকান্ত শর্মা। এগিয়ে
আসছে এই দিকেই | চট করে টাইমটেবল তুলে ধরে মুখ আড়াল
করলাম | পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে চোখে পড়ল শুধু মূল্যবান
ট্রাউজারের নীচে একজে ড়া ঝকমকে স্থ্য, আর নীল শাড়ির তলায়
একজোড়া সাদা চপ্পল।
লিফট্-এর দরজা বন্ধ হয়ে ওপরে উঠে যেতেই টাইমটেবল রেখে
উঠে দাড়ালাম । বুকটা আবার টনটন করছে। পুরোন ক্ষতের
বেদনা । অনেকদিন আগেকার ভালবাসা অসহা যাতনা নিয়ে
আবার জেগে উঠছে । মেয়েটি কি আমাকে দেখেছে ?
“আজ যাচ্ছেন নাকি ? শুধোয় কাউন্টারের ক্লার্ক |
“না, না, বলতে পারছি না কবে যাবো ।,
সারাটা! সকাল হুইস্কি খেয়ে রোদে রোদে ঘুরে বেড়ালাম।
লাশটা শুধু আমি একাই দেখি নি-_ দেখেছে মহেন্দ্র, দেখেছে বুড়ি-_
আরও অনেকে । পুলিসও নিশ্চয় আহাম্মকের মত তদন্ত করে নি,
অন্ততপক্ষে জনদশেক লোক সাক্ষী দিতে পারে যে কন্তুরী মৃতা।
তাঁই যদি হয়, তাহলে নিশিকান্ত শর্মার সঙ্গে যে মেয়েটিকে এইমাত্র
দেখে এলাম, সে আর কন্তরী এক মেয়ে নয়। হতে পারে
না। ব্যস, আর কোন উদ্ভট কল্পনাকে মাথায় স্থান দেওয়।
হবে না। একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলাম । কস্তরী মারা গেছে
'**বুরুজের নীচে পড়েছিল তার লাশ-.'উম। দেবী.*'কিস্ক সামনে
ঘযে'*'
১৩০
আর একটু হুইস্কি চাই:*-হঠাৎ বিছ্যাৎচমকের মত মনে পড়ে
যায় কম্তরীর সেই কথা কটি £
এর আগেও এখানে এসেছি আমি । অনেক: অনেক দিন
আগে। আমার পাশে ছিল আব একজন পুকষ-" কালো চাপদাড়ি
ছিল তার গালে.
বোকা! বোক।! একদম বোকা আমি |] এই সহজ
কথা গুলোর অর্থ ধরেও ধরতে পারি নি এতদিন। যে কস্তবরীকে
জেনেছি, তার সন্তা হঠাৎ একদিন ঘুমিয়ে পড়েছিল উম! দেকীর
আবির্ডাবে। আর আজকে ওই যে মেয়েটি _ওর সান্তাকেও কি ঘুম
পাড়িয়ে দেওয়া যায় না কন্তরীর আবিগাব দিয়ে?
রাত্রে আবার ডাইনিং কমে মেয়েটিকে দেখলাম । নিচু গলায়
ওয়েটারকে কি যেন বলছেন নিশিকান্ত শমা। আর হাতের ওপব
থুংনি বেখে যেন স্বপ্ন দেখছে মেয়েটি। একটা ভুইস্কি নিয়ে এসে
বসলাম। ভাগ্যের কি পরিহাস! কোন অভাবই ছিল ন!
কস্তরীর। আজ তাবই সম্পন্তি ভোগ করছে অন্থজন, আর সে
কিনা কণ্ঠলগ্ন। হয়ে বয়েছে নিশিকান্ত শর্মীব মত নারীমাংসলোলুপ
একজন পুকষের ৷ মেয়েটির বিষণ্ন চোখ ছুটি উতলা করে তোলে
আমার মনকে । কানের ছুল ছুটি অতি সাধারণ এবং বদ্কচির
পবিচায়ক | মুক্তোর রঙে পালিশ কর থাকত যে নখ -আজ ত।
শ্রীহীন। আব এক কন্তরীর সুষমার সাথে কি বিপুল প্রভেদ এই
কম্তুরীর শ্রীহীনতার। এ যেন একটা সুন্দৰ ছবিব অত্যন্ত খারাপ
নকল। টুক টুক করে খাচ্ছিল মেয়েটি । অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ
কি মনে পড়তে উঠে দীড়াল নিশিকান্ত শর্মী। সিধে হল
গেকে বেরিয়ে গিয়ে উঠল লিফটে । দ্বিতীয় কস্তরী বসে রইল
চেয়ারে ।
এই সুযোগ! নিশ্চয় কোন কাছ ঘরে গেছে নিশিকান্ত।
এ স্ুযোগকে কাজে লাগতে পারব কি আমি? এত সাহস কি হবে?
১০৯
এক চুমকে গেলাসটা শেষ করে দিয়ে গটগট করে এগিয়ে গিয়ে
দাড়ালাম মেয়েটির সামনে ।
খুব আস্তে আস্তে চোখ তুললো সে ; একটু বিরক্তি মিশোনে৷
দৃষ্টি মেলে ধরলো! আমার মুখের ওপর ।
বুকটা দমে গেল; তবুও জোর করে হেসে বললাম, "বসতে
পারি ?
অনিচ্ছার সঙ্কে নীরবে ঘাড় হেলিয়ে বসতে ইঙ্গিত করলে
মেয়েটি।
সময় ন্ট করলাম না; বললাম, “আমার নাম ছর্লভ সামন্ত ।
মনে পড়ছে ?'
কপাল কুঁচকে মনে করব"র চেষ্টা করল মেয়েটি । তারপর বলল,
'না তো-."মাপ করবেন ।'
“আপনার নাম ?
“স্বলতা মিত্র”
প্রতিবাদ করতে গিয়েও সামলে নিলাম নিজেকে । সত্যিই তে।
নাম তে এখন পাণ্টে গেছে। পাশ থেকে আরও খুটিয়ে খুঁটিয়ে
মুখটা দেখতে লাগলাম । কপাল, চোখের রঙ, নাকের রেখা, উচু
হন্থ--সব আগের মত। স্মতির কোঠায় তুলে রাখা ছবির সঙ্গে
হুবহু মিলে যায় । চোখ বুঁজলে মনে হয় যেন যাছঘরেই বসে
রয়েছি-__সামনে রয়েছে কস্তরা |, কিন্তু অমিলও আছে-খোপা
বাধার কায়দা সেরকম নয়, লিপষ্টিক সন্বেও অধরোষ্ঠে নেই সেই
শাণিত রেখা |
“আগে কলকাতায় থাকতেন ?
'না, বর্ধমানে।
“ঠিক করে বলুম! ছবি জাকতেন না ?'
না),
্যামনগরে কোনদিন গেছেন £
১০২
'সে কোথায়?
“কেন মিথ্যে বলছেন ?
ভাসা ভাস৷ শূন্য ছুটি চোখ মেলে ধরলে মেয়েটি। বললে, “মাপ
করবেন, মিথ্যে বলি নি।ঃ
“আজ সকালেই এ-ঘরে আমাকে দেখে চিনতে পেরেছিলেন
আপনি । এখন এমন তান করছেন যে--,
ভুরু কুঁচকে বলে মেয়েটি, ক বলতে চান ?
দোষ নেই ওর। মনে মনেই বলি। অনেক বছর কেটে
যাওয়ার পর কন্তরী জেনেছিল সে উমা দেবী । আর আজকে এত
সহজেই কি স্ুলতার মনে পড়বে নিজেকে ? মনে পড়বে যে সে
কন্তরী, আর কেউ নয় ?
“নেশা করেছি আমি, কিছু মনে করবেন না, বিড়বিড় করে
বলি আদি | 'আমার রুম নাম্বার সতেরো : দরকাঁর হলে চলে
আসবেন ।,
লিফট থেকে নিশিকান্তকে প বাড়ীতে দেখেই কথা শেষ করে
এনেছিলাম, এখন চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে গেলাম বারের দিকে । এক
চুমুকে একট! হুইস্কি শেষ করে দিয়ে হল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
রাতের খাওয়ার কথ। আর মনেই ছিল ন11
রুম-নাশ্বার লেখা বোটার সামনে গিয়ে দাঙালাম-নিশিকান্ত
শর্মী; এগারো নম্বর ঘর।
মাথার মধো ফাকা ফাকা মনে হচ্ছে। অভয়! কিন্তু কিসের
ভয়? নিশ্চয় চিনতে পেরেছে ও! আর যদি না চিনে থাকে,
তাহলে এ-রহস্তের উত্তর থাকে তিনটি £ হয় ভান করছে, না হয়
স্মৃতিহীনতা, অথব! কন্তুরীই নয় |
তোরবেল। ঘুম ভাঁঙতেই আবার সব মনে পড়ে গেল। উন্মাদ__
মদের ঝেকে গত রাতে কি সব আবৌল-তাবৌল ভেবেছি। কটকে
১৩৩
আর নয়; আগে স্বাস্থ্য--তারপর আন্মুক স্থলতা মিত্র-_-রূপে যে
দ্বিতীয় কম্তরী !
বারান্দায় বেরিয়ে এসে টুথব্রাশ ঘষতে ঘষতে হঠাৎ চমকে
উঠলাম, হনহন করে ফটক পেরিয়ে যাচ্ছে কে? নিশিকান্ত শর্মা
না? সঙ্গে তো সুলতা মিত্র নেই !
তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে এগারো নম্বর ঘরের দরজায় টোক!
দিলাম_ চেনা জনের আলতো টোকা]
কে?
“ছুর্লভ /
দরজ খুলে গেল ; লাল চোখ-চোখের পাত। ফুলে উঠেছে ।
বেশবাস আলুথালু।
“কি ব্যাপার সুলতা ?
আবার কেঁদে উঠল সুলতা ।
তেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। “কাদছে। কেন? কি
হয়েছে 2
“আমাকে আর তাল লাগছে না, তাই চলে গেল ।'
একটুও উচ্ছ্বাস না দেখিয়ে অপলক চোখে অশ্রুসিক্ত মুখটির
দিকে তাকিয়ে রইলাম | কস্তুরী--হ্যা, সেই ক্তরী-.যে অভিনয়
করেছে আমার সাথে, হয়তো আরও অনেকের সাথে । ট্রাউজারের
পকেটে ছুই হাতের মুঠি শক্ত হয়ে গঠে আমার | সামান্য বেঁকে
যায় ঠোটের হাসি ।
“এই জন্যে এত কান্নাকাটি? ওকে তোমার যে-জন্যে দরকার,
সে-জন্তে তার জায়গায় আমি তো! এসেছি ?
আগের চাইতেও দরদরধারে ঝরে পড়ল স্ুলতার অশ্রু । না"*"
না...তুমি না!
“কেন নয়? আলতো করে চিবুকটি তুলে ধরে শুধোলম
আমি।
॥ তিন ॥
হোটেল কসমোপলিটান ছেড়ে নতুন হোটেলে এসেছিলাম শুধু
খরচ কমানোর জন্তেই নয়। নিশিকান্ত শর্মার শ্ঠেন দৃষ্টিও এড়ানো
গিয়েছিল অনায়াসে ।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে প্রসাধন করছিল সুলতা | লম্বা
লম্বা কুচকুচে কালে। চুলের রাশির দিকে তাকিয়ে আনমনে একটা
সিগারেট লাগালাম ঠোটেব কোণে।
একমুখ ধেশয়া ছেড়ে বললাম, “তোমার এ খোপা বিশ্রী লাগে
আমার। অন্যভাবে বাধতে পারো না?
কিভাবে
ধরে। বাদিকের ঘাড়ের ওপরে সামান্য হেলিয়ে ?'
ঝেশোকের মাথায় বলে ফেলেছিলাম কথাটা। রাগ হচ্ছিল
নিজের ওপর । নতুন করে ঝগড়া বাধিয়ে কি লাত ৭ আজ কটা
দিন ধরেই তে! চলছে কথা কাট।কাটি, আর রাগারাগি । শুধু
ঘুমের সময়টুকু ছাড় দিবারাত্র খাঁচার বন্দী জন্তর মতই গজরাতে
গজরতে লড়ে চলেছি ছুজনে | বিরাম নেই থাবা আর দাত
দেখানোর । কেন আবার নতুন করে স্থত্রপাত করা সেই একই
বাদান্বাদের ?
তাড়াতাড়ি বললাম, “নীচে আছি । তাড়াতাড়ি এসো ।'
হুইস্কির আমেজে রিমঝিম করছিল মাথার কোষগুলো | মদ
খেতে আর বাধ কি? আর তো! কোনো৷ সংশয় নেই! সুলতা
মিত্র দিবিব গেলে বলতে পারে কন্তরী তার নাম নয়--কিস্ত আমি
তো জানি সেকে। আকাশের ওই ঞুবতারা যদি সত্য হয়, তা
হলে আমি যা! জেনেছি তাও সত্য। শুধু অনুভূতি দিয়ে নয়,
১৩৫
প্রেত-প্রেয়সী-”*
অনুমান দিয়ে, দেহের সমস্ত অণুপরমাণু দিয়ে জেনেছি সেই
সত্যকে | মাঝে মাঝে তেবেছি, রক্ষিতা না হলেই কি চলতো ন!
কম্তরীর ? দৈহিক সুখ দেওয়ার জন্য কন্তরীর ব্যগ্রতা দেখে কষ্ট
পেয়েছি ।
সিড়ি বেয়ে নেমে আসছে সুলতা | চাপা। ঠোঁটে নীরব বিদ্রোহ ।
শাড়ির রঙটা মোটেই ভাল লাগল না আমার | শুধু শাড়ি কেন,
রাউজের রঙটাও যেন বড্ড বেশি ঝকঝকে । বুক পেট বার কর!
অসত্য ছাট । পায়ে চগ্পলের বদলে হাইহিল জুতোই ছিল তাল।
মুখটাতেও একটু অদলবদলের দরকার | গাল ছুটো৷ যেন আরও বসে
গিয়ে উদ্ধত করে তুলেছে হম্থু ছটোকে। ভুরুতে পেন্সিলের দাগ
অতটা! না হলেও চলতে। | পালটায় নি শুধু চোখছুটি-_শাস্ত, সুন্দর,
গভীর । একমাত্র অকাট্য প্রমাণ এই চোখ । নেমে এসেছিল
স্বলতা | হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম আমি । ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে
জড়িয়ে ধরি, বুকে টেনে নিই.."আর.-.আর নিবিড় বাহুবন্ধনে
শ্বাসরোধ করে দিই |
থুব দেরি করি নি, কি বলো? বলে সুলতা |
অনেকটা কৈফিয়ৎ দেওয়ার সুর সুলতার কণে। ঠিক সে
রকমটি নয়। পরিবেশ মত মানানসই শব্দ চয়ন করতেও তুলেছে
কন্তরী | আমার হাত ধরেছিল ও | ভীক্ হাতে নিঃশেষে নিজেকে
বিলিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত" 'দুর্ঘভ নয় মোটেই | আর আছে ভয়-'
সে তয় আমার প্রতি । অসহ্য । বিরক্তিকর । নিঃশবে পাশাপাশি
হাটছিলাম আমরা | ভাবছিলাম, মাসখানেক আগেও যদি কেউ
এসে বলতো, কন্তরীকে তুমি ফিরে পাবে এইভাবে, তাহলে
আনন্দের আর সীমা পরিসীমা থাকতো না।
কিস্ত আজ ? চেয়ে পাওয়ায় যে এরকম বেদনা! আছে,,তা তো!
জানতাম না। ৃ
থরে থরে জিনিস সাজানো দোকানগুলোর কাচের জানলার
১০৬
সামনে এসে থমকে দীড়িয়ে যাচ্ছিল নুলতা | এইতেই মেজাজ
খারাপ হয়ে গেল আমার |
একটু রুক্ষম্বরেই বললাম, “যুদ্ধের দিন কটা খুব অভাবের মধ্যেই
কেটেছে-_তাই না?
“সত্যিই তাই ।,
উচ্চারণে দারিদ্র্যের সুর অন্তর স্পর্শ করলো আমার ।
শুধোলাম, “তারপরেই নিশিকান্ত শর্মা এল-_যেটুকু ছিল, তাও
গেল, কি বলো? জানতাম, আঘাত পাবে সুলতা | তবুও না বলে
পারলাম না।
“আমার কপাল ভালো তাই পেয়েছিলাম ভদ্রলোককে 1
এবার আঘাতপা ওয়ার পালা আমার | এই তো চলেছে | আঘাত
দেওয়া নেওয়ায় বিচিত্র খেল | আমি কিন্তু সহা করতে পারলাম না।
“দেখো... শুরু করেই থেমে গেলাম। কি লাত? টানতে
টানতে স্থলতাকে নিয়ে এলাম শহরের মধ্যে |
অন্ুযোগের স্বরে বলে উঠলো সুলতা, “দৌড়োচ্ছো কেন?
বেড়াতে বেরিয়ে এত তাড়াতাড়ি যাওয়ার কোনে। মানে আছে ?
জবাব দিলাম না| এবার দোকানের কাচের জানলা লক্ষ্য
করার পালা আমার । অণ্চরেই দেখতে পেলাম যা চাইছিলাম ।
কাউন্টারের সামনে এসে সংক্ষেপে বললাম, শাড়ি ব্লাউজ 1
“দোতলায় যান।'
মন স্থির করে ফেলেছি আমি । একটা তীত্র আনন্দ চিনচিন
করছিল মনের মধ্যে । এবার স্বীকার করতেই হবে ওকে! জোর
করে স্বীকার করাকে 1".
“কি করছে।? ফিসফিস করে বলে সুলতা ।
চুপ করো?
হুকুম দিলাম দোতলার কাউন্টারে, “কিছু শাড়ি আর রাউজ
দেখান | সের! জিনিস দেখাবেন ॥
১০৭
একটা টুলে বসে পড়লাম । যেন অনেকট! পথ একটান! দৌড়ে
আসায় দম ফুরিয়ে গেছে--এমনিভাবে হাঁপাচ্ছিলাম আমি । পর
পর কয়েকটা মূল্যবান শাড়ি নামানো হলে কাউপ্টারে। কিন্ত
সুলতা দেখবার আগেই পছন্দ শেষ হয়ে গেল আমার । একটা
কালো শাড়ি আর হলদে ব্লাউজ নিয়ে স্ুলতাঁর হাতে দিয়ে হুকুম
করলাম, ছুটোই নাও। পরে দেখো--কিরকম মানায় দেখতে চাই
আমি ।'
দ্বিধা! ফুটে উঠেছিল সুলতার মুখে । কিন্তু প্রতিবাদের সাহস
হলো না । তাই বোবার মত পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ছোট্ট ঘের!
জায়গাটির দিকে! টুল ছেড়ে উঠে পড়ে পায়চারি করতে শুরু
করলাম আমি । পুরোনো দিনের সেই উত্তেজন! নতৃন করে উপলব্ি
করলাম। কন্তরী আসবে-- প্রতীক্ষায় দাড়িয়ে আছি আমি।
উত্তেজনায় ওঠানাম। করছে বুকের খাঁচা। মনে হচ্ছে যেন শ্বাস রুদ্ধ
হয়ে আসছে । আবার আগেকার জীবন ফিরে পেয়েছি । পকেটের
মধ্যে চেপে ধরলাম আয়নাটা । অসহ্য হয়ে উঠেছে সাসপেন্স।
এদিক-ওদিক তাকাতে গিয়ে চোখে পন্ডল একটা বাদামী রঙের
শাড়ি। একটা নয়। অনেকগুলো। কিন্ত কোনোটাই ঠিক সে
রকম নয় | হুবহু কি রকম, তাও মনে করা সম্ভব নয়। স্মৃতির
বিশ্বাসঘাতকতা নয় তো?
খুলে গেল কিউবিকূল-এর দরজ1| বৌ করে থুরে দীড়িয়েই
নিদারুণ চমকে উঠলাম আমি |
সামনে ফ্রাড়িয়ে সেই অপরূপা নারীমুত্তি..কম্তরী আবার প্রাণ
ফিরে পেয়েছে । কন্তরী ! সত্যিই কন্তরী | আমাকে চিনতে পেরেই
যেন থমকে দীড়িয়ে গেছল নারীমৃত্তি। তারপর পায়ে-পাঁয়ে এগিয়ে
এল কাছে.*.আরও কাছে...ফ্যাকাশে মুখ...রহস্যঘের! কাজলকালে।
চোখ-*'আগের মতই""'কোনো! তফাৎ নেই | না, না| এখনও তফাৎ
আছে। সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কানের ওই ছুল হটোর জন্তে।
১০৮
চাঁপা গলায় গজরে উঠলাম, "খুলে ফেলে”
স্থলতা বুঝতে পারে নি তখনও, তাই নিজের হাতেই জোর করে
টানাটানি করে খুলে ফেললাম ছুল ছটো। তারপর পিছিয়ে ঘাড়
কা করে আপাদমস্তক চোখ বুলোলাম চিত্রশিল্পী দৃষ্টি নিয়ে |
কোথায় ষেন একটা খু'ৎ থেকে যাচ্ছে।
ঠিক আছে। ওই বাদামী শাড়িটাও নাও। এ সবই কন্তুরীর |
জুতোর ডিপার্টমেন্ট কোনদিকে ? এসে 1,
বাধা দিল না সুলতা | কোনো জুতোই পছন্দ হচ্ছিল ন!
আমার । দেখতে দেখতে জুতোর পাহাড় জমে গেল পাশে।
স্বলতা কি বুঝেছে কি চাই আমি? খুব সম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত পেলাম চকচকে ছোট্ট জুতোজোড়।। সুলতার
পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে বললাম, পরে দেখো । ঠিক আছে।
হাটো।।,
আটসাট কালো শাড়ি হলদে বাউজ আর হাইহিল জুতোয়
ন্থলতাকে মনে হলো ইথার দিয়ে গড়া এক অশরীরী মুত্ি।
হী করে কাউন্টারের ছোকর! তাকিয়েছিল আমার পানে |
ক্যাশমেমো করতে বলে স্বলতাকে টানতে টানতে নিয়ে এলাম
প্রমাণ সাইজ আয়নার সামনে ।
“দেখো | কন্ভরী, দেখে। নিজেকে । ভালো করে দেখো 1
“একি হচ্ছে” অনুনয়ের সুর |
থাক ! মনে করে দেখো--"চেষ্টা করো-"'আয়নার ওই ভদ্রমহিল!
আর যেই হোক-_স্থুলতা মিত্র নয় | চেষ্টা করো!
প্রবল উত্তেজনায় জোরে জোরে ওঠানাম। করছিল স্থুলতার বুক ।
তয়ে পাংশু হয়ে গিয়েছিল মুখ।
এখনও শেষ হয় নি। টানতে টানতে স্ুলতাকে নিযে নেমে
এলাম নীচে । খোপার কায়দা নিয়ে পরে মাথা ঘামানো যাবে "খন।
আপাতত দরকার সেই স্ত্ুগন্ধি। চকিতে মনকে অতীতের পষ্ঠায়
১০৪)
নিয়ে যেতে অদ্বিতীয় সেই কন্তরীকে এখন দরকার | দেখাই যাক
না কোথাকার জল কোথায় দাড়ায়। ফলাফল নিয়ে আর মাথ!
ঘামাই না আমি |
কিন্ত বৃথাই অনেক বোঝালাম, ঝরাফুল গন্ধের সঙ্গে তুলন।
করলাম_ কেউ বললে বুঝতে পারছি না, কেউ বললে যুদ্ধের আগে
পাওয়া যেত। আজকাল আমদানী বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু সে স্থবাস না পাওয়া গেলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যে
অতীতের পুনরুজ্জীবন !
কন্ুুইতে টান দিয়ে ফিসফিস করে উঠল ন্ুলতা, “এই, কি
ব্যাপার বলে। তো! ?
“কি ব্যাপার? কিছুই কি এখনে। বুঝতে পারছো! না %
চুপ করে শাস্ত ছুই চোখ মেলে দাঁড়িয়ে রইল স্থুলতা |
ক্যাশে টাক! মিটিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায় । পাশাপাশি
হাটতে লাগলাম ছুজনে | ছুজনেই নিশ্চুপ |
কিছুক্ষণ পরে কথার খেই টেনে নিয়ে বললাম, “আমি চাই
তোঁমার মধ্যেই তোমাকে আবিষ্কার করতে, আমি চাই যা সত্য, তা
জানতে ।'
কোনো জবাব ' দিলো না স্থলতা। আমার মুঠোর মধ্যে ওর
নরম হাতের স্পর্শে উপলব্ধি করছিলাম আমার প্রতি ওর ভয় আর
বিদ্বেষ । শক্ত করলাম মুঠি--আর ওকে পালাতে দেব ন!। কোন-
মতেই না।
গলার স্বর খাদে নামিয়ে এনে বললাম, “ভুমি সুলতা মিত্র নও |
কখনই ছিলে না।'
প্রত্যুত্তরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুলতা |
চকিতে মাথায় রক্ত চড়ে গেল আমার । এই প্রথম নয়, যতবারই
ওকে এইভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে শুনেছি, ততবারই মেজাজ খিচড়ে
গেছে আমার । অসহ্য!
১১৩
'জানি, জানি, কি বলবে তুমি, আমি জানি। নুলত৷ মিত্র
তোমার নাম, বোম্বাই তোমার জন্বস্থান। বাবার নাম বিরুপাক্ষ
মিত্র, মায়ের নাম আয়েষ! মিত্র |:'অনেক"' "অনেকবার তো শুনলাম
এই বৃত্তান্ত! কিন্তূ-'কিন্ত তুমি কেন বুঝতে পারছে! ন। যে, সব
ভুল**'সমস্ত ভূল."'মারাত্মক ভুল!
“দোহাই তোমার । আবার কি গোড়া থেকে শুরু করবে
নাকি ?
“চেষ্টা করো'-"*একটু চেষ্টা করে৷ মনে করতে । মনে করে দেখো,
তুমি আসলে কে? কি তোমার আসল নাম।.*.আচ্ছা, কখনও
কঠিন অস্থুখ করেছিল তোমার ?'
তেমন কিছু না;
“অনেক সময়ে অন্থুখের পর এরকম হয়|”
“সে-রকম কিছুই হয় নি আমার | বছর দশেক বয়েসে একবার
হাম হয়েছিল ।,
না, না, তা নয় |;
“আমি আর পারছি না, রেহাই দাও আমাকে ॥
ধৈর্য হারালে চলবে না। সহিষ্ণুতাই এখন আমার একমাত্র
হাতিয়ার । কিন্তু কস্তরীর জেদও তো। বড় কম নয়- রাগ হয়ে যাওয়া
স্বাভাবিক।
হাঁটতে হাটতে একটা কিউবিও শপের সামনে এসে পড়েছিলাম
আমরা | শো-কেসে বিস্তর কাশ্মীরি শৌখিন জিনিস' মোরাদাবাদি
পাত্র, প্রায়-জীবস্ত নেউল আর সাপ সাজানো দেখেই মাথায়
একটা মতলব এল, স্থলতাকে টেনে নিয়ে ঢুকে পড়লাম তেতরে।
ঢুকেই বুঝলাম ভুল করেছি।
পরপর চারটি ঘরে সাজানো ছিল মস্ত-মস্ত অয়েলপেন্টিং
পাথরের অপরূপ সুন্দর যুণ্ি, বিচিত্র বাডলইন, হাঁতীর ধাতের অদ্ভুত
বাক্স আর পৌপিলেনের খেলনা । মেবেতে পুরু গালিচা পাতা।
৯১১৯
এ-ঘরে সে-ঘরে নেই কোন শব । থমথমে নিস্তন্ধতার মধ্যে
আচম্িতে স্বলতারও কণ্ঠ নেমে এসেছে খাদে__আর চকিতে যেন
ভোজবাজির মতই পাণ্টে গেল সমস্ত পরিবেশটা । মনে হল,
সেদিনের মতই আমরা পাশাপাশি নিঃশবে' ঘুরে বেড়াচ্ছি যাহুঘরের
কক্ষে কক্ষে--আমার পাশেই হাতে হাত দিয়ে হাটছে রহস্যময়ী
কন্তরী কৌশিক-_-সুলতা মিত্র নয়।
প্রচণ্ড বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল বুকটা | অব্যক্ত যাতনায়
বোধ হয় মুঠি আরও শক্ত হয়ে উঠেছিল-_সুলতা৷ অস্ফুট শব্দ করে
উঠতেই পলকের মধ্যে সামলে নিলাম নিজেকে । সোনালি
কারুকাজ-করা ফ্রেমে বাঁধানো একটা! তৈলচিত্রের সামনে ফাড়িয়ে
শুধোলাম, “এধরনের ছবি তোমার ভাল লাগে ?
না; ছবির সম্বন্ধে কিছুই বুঝি না আমি ।'
এবার আমারই বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। পাশের
ঘরে ঝুলছিল, সারি সারি শোকেসে অজভ্র জন্তর চামড়া । বন্ত-
আবহাওয়ায় দাড়িয়ে একটু রুক্ষ স্বরেই শুধোলাম, এবার বলে।।'
“কি বলবো ??
“সমস্ত ;কে তুমি; কি করেছিলে তুমি? কেন করেছিলে
$
তা?
উঃ, ভগবান! কতবার আর বলবো ?
“কলকাতায় কোনদিন যাও নি ?”
“সাতদিনের জন্তে একবার গিয়েছিলাম |,
কি আশ্র্য! এমনভাবে জেরা করছি স্থলতাকে যেন মহা
অপরাধে অপরাধিনী সে। এ ঠিক হচ্ছে না। ভাবছে ভাবতে
আবার তিক্ততায় ভরে উঠল মমটা। দিশেহারা হয়ে একি করছি
আমি?
পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলাম বাইরে । আবার রোদ, আর
গাড়ি-ঘোড়ার নির্থোষের মধ্যে এসে যেন বাঁচলাম | আর নয়,
১১২
অনেকক্ষণ ধরে নির্যাতন করা হয়েছে বেচারি ক্করীর ওপর-_-এবার
ও একল। থাকুক । আমারও একল। থাঁকা দরকার..'অস্তত কিছু-
ক্ষণের জন্যে ।
“এ-তাবে বেড়াতে ভাল লাগছে ন। তোমার, তাইন1? এই নাও
** যা তোমার দরকার, ভাই নাও । কয়েকটা দশ টাকার নোট
ম্বলতার হাতে গুজে দিয়ে বললাম, “একল] একল! যতটা পারে৷
ফুতি করে নাঁও-..তারপর আবার দেখ! হবে হোটেলে ।
নির্ভাষফ চোখ মেলে নোটগুলি নিলে সুলতা; মুখে বললে,
“বেশি দেরি কোরে না।'
আবার রাগ হয়ে গেল নিজের ওপর, আবার ভুল করলাম
আমি! কেন? কেন আমি রক্ষিতার মখাঁদা দিয়ে রাখছি
স্থবলতাকে ! এত পরিশ্রম একেবারেই বরবাদ হয়ে গেল সামান্ত
একটি ভুলে? নির্বোধের মত আমিই তো! তাকে না-সুলত। না-
কন্তরী বানিয়ে রাখছি।
বিশ-তিরিশ গজও যায় নি স্থলতা, আচমকা নিঃসীম শঙ্কায় ছুলে
ছলে উঠল মনটা । রোদ্ধর ঝকমকে ফুটপাতের ওপর ওর চলার
ভঙ্গিমা, কাধের দোলন, আর প্রতিবার পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে
তম্বীদেহে ছোট ছোট হিল্লোলের সঙ্গে তো আমার আজকের পরিচয়
নয়! এ যে চেনা--'বড় চেনা-".কতদিন দেখেছি এইভাবে তাকে
চলে যেতে...ওই তো ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় নেমেছে ও"-'রাস্তা
পেরোচ্ছে'*-সবনাশ ! আর যদি ফিরে না আসে ?,
ছুহাত বাড়িয়ে কিছুটা ছুটে যাই আমি ।
পরক্ষণেই থমকে দীড়িয়ে যাই। মূর্খ! আর পালাবে ন! কন্তুরী..
কোন তয় নেই...এত বোকা] নয় ও.".আমার মত ব্বর্ণহংসকে ফেলে
অকারণে গা ঢাক! দেওয়ার মত আহাম্মুখি ও করবে না।
কিন্তু কেন এত দেরি হচ্ছে? কেন এত সময় নিচ্ছে কস্তরী
নিজেকে জাগিয়ে তুলতে ? ছুই সত্তায় ছন্দ লেগেছে কি? এমনও
১১৩
হতে পারে তো, শেষ পর্যস্ত কন্তরী আর ফিরে আসবে না- "সুলতা
মিত্রই হবে চিরস্থায়ী ?
আচ্ছা, তাই যদি হয়, তবে কেন আমি সুলতা মিত্রকেই
তাঁলবেসে সুখী হতে পারছি না? কেন মিছিমিছি একটা অলীক
কল্পনার পেছনে ছুটতে গিয়ে বিরামবিহীনভাবে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে
বিষিয়ে তুলছি পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কটুকু ?-"*শেষ পর্যন্ত যদি
আমার নিরস্তর সন্দেহ, বদমেজাজ, নির্যাতন আর বকাবকি সহ্য
করতে না পেরে আবার উধাও হয়ে যায় কস্তরী ? হঠাৎ একদিন
যদ্দি সুটকেস গুছিয়ে নিয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যায় ?
ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মত মুহুর্তের মধ্যে অসাড় হয়ে গেল
আমার পাঁ-ছটো। সামনের ল্যাম্পপোস্টট। ধরে সামলে না নিলে
পড়েই যেতাম ফুটপাতের ওপর | ছুঃসহ এই জন্ভাবনার চিস্তাটুকুই
যেন শ্বাসরোধ করে আনছিল আমার ।
অনেকক্ষণ পর হৃদরোগীর মত ধুঁকতে ধু'কতে আবার পথ
চলতে লাগলাম আমি । বেচারি কন্তরী !--.অযথ! নির্যাতন করে
নিষ্ঠুর আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছি বার বার” কিন্তু কেন-..কেন কথা
বলতে চাইছে না ও?
যদি হঠাৎ বলে? “হঠাৎ যদি ঘুরে দীড়িয়ে মুখের ওপর বলে
ওঠে £ হ্যা, আমি মরে গিয়েছিলাম | শ্মশান থেকে উঠে এসেছি
আমি | এই কালো চোখ দিয়ে আমি দেখেছি."
সঙ্গে সঙ্গে কি বিহ্যুৎস্পৃষ্টের মত আছড়ে পড়ে নিশ্প্রাণ হয়ে
যাবে না আমার দেহ?
সত্যি সত্যি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি? কিন্তু কিরে
মেনে নিলে এসব পাগলামে ছাড়া আর কি?
অনেকক্ষণ উদ্ভ্রান্তের মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে হোটেলেন পথ
ধরলাম | কাছাকাছি এসে ফুলের দোকনি থেকে একটা গোলাপের
তোড়া কিনলাম | ঘরের পরিবেশ খানিকটা! পালটাবে ফুলের
১১৪
আবিভাবে | ন্ুলতাও নিজেকে আর বন্দিনী মনে করতে পারবে
না। গোলাপের তেজালো সুবাস মনকে মুহুর্তের মধ্যে উধাও করে
নিয়ে গেল আর একটি দিনে-*.বিশ্বীসহস্তার মতই ফিরে এল পুরোন
স্মৃতি। ঘরের দরজা খুলেই মনটা! আবার তেতো হয়ে উঠল।
খাটের ওপর শুয়ে রয়েছে সুলতা | পাশের টিপয়ের ওপর আছড়ে
ফেলে দিলাম তোড়াট!।
ভালো তো? শুধোই আমি।
না, ভালে নেই স্মুলতা | কীাদছিল ৩.'-নিঃশব্দে জল ঝরছিল
গাল বেয়ে বালিশের ওপর |
ছুই মুঠি শক্ত করে ছুটে গেলাম সামনে, “কি হয়েছে? বলো
কি হয়েছে?
নিরুত্তরে তবুও কাদতে লাগল সুলতা! |
আস্তে আস্তে নিচু হয়ে ওর মুখটি আলতো! হাতে ধরে ঘুরিয়ে
দিলাম আলোর দিকে ।
কন্তুরীকে কোনদিন কাদতে দেখিনি আমি । তবে জলে-ভেজা
মুখ একদিন দেখেছিলাম _গঙ্গার তীরে--জল থেকে উদ্ধার করার
পর |
দুই চোখ মুদে বিড়বিড় করে উঠি অবরুদ্ধ কণ্ঠে, চুপ করো!
থামাও কান্না! জানো না, তোমার কানা আমাকে কতখানি
কষ্ট...
তারপরেই আচমক1 রেগে গিয়ে মেঝের ওপর লাথি মেরে
চেঁচিয়ে উঠেছিলাম, চুপ করো! থামে1!
ধড়মড় করে উঠে বসেছিল সুলতা ; আস্তে আস্তে বুকের কাছে
টেনে নিলাম ওকে । মিনিট খানেক নিবিড়তাবে বসে রইলাম
দুজনে । তারপর গলা জড়িয়ে ধরে বললাম, *মাপ করো? আমার
নার্ভ ঠিক নেই। ক্ষমা করো" আন যে তোমায় ভালবাসি''বড়
ভালবাসি !
১১৫
ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসতে লাগল দিনের আলো | নিচে
রাস্তায় ক্যাচ করে ব্রেক কষলে। একট মোটর । চাঁদের আলে!
খড়খড়ির ফাক দিয়ে এসে পড়ল গপাশের দেয়ালে । গোলাপের
স্ববাস তাসছে ঘরের বাতাসে । স্থলতাকে বুকে নিয়ে শাস্ত হয়ে
এসেছিলাম আমি | কি হবে অন্তহীন অনুসন্ধানে? একে নিয়েই
তো! সুখী আমি? কন্তরীকে পেলে আরও তাল হতে? কিন্তু
এই চাঁদের আলোয় পাশে শায়িতা নারীমূত্তিকে কন্তুরী বলে কল্পন৷
করাও কঠিন। কন্তুরী হারিয়ে গেছে--চিরতরে বিদায় নিয়েছে ।
চলো, খেয়ে আসি ।” ফিসফিস করে বলল সুলতা ।
“না, থাক। খিদে নেই আমার 1
বড় ভাল লাগছিল এই বিশ্রামটুকু। এইতাবেই সারাটা রাত
আমার পাশে শুয়ে থাকবে স্ুলতা...ভোরের আলো না ওঠা পর্যস্ত
কাধের ওপর মাথা দিয়ে আমার বাহুবন্ধনে নিজেকে ছেড়ে
দেবে ও.-'কস্ত্বরী'"'না ".কন্তরী নেই.*..ও ছুটো নাম এক নয় **
কোনকালেই ছিল না-..খামোক। ছুইকে এক করার আর কোন
দরকার নেই, আর আমার ভয় নেই ।
“আর আমার ভয় নেই |, বিড়বিড় করে বলেছিলাম আমি ।
কপালে আলতে! টোক1 দিলে সুলতা । গালের ওপর উষ্ণ
নিশ্বাস অন্ুতব করলাম। বাতাসে গোলাপের সৌরত যেন আরও
গাঁ, আরও মদির হয়ে উঠছে, কোমল তন্বী দেহের উত্তাপ যেন
আমার শরীরে প্রবেশ করছিল'* চোখে মুখে হাত বুলিয়ে আদর
করছিল যে-হাত, অন্ধকারে মুঠির মধ্যে ধরলাম সেই হাতটি ।
এস |
আরও পাশে সরে এল তথবীদেহ | হাতটা তখনও আমার মুঠির
মধ্যে। তুলতুলে নরম আঙ্ল | এবার আমি চিনেছি'' সেই হাড়-
বারকরা সরু ক্জি, খাটো বুড়ো আঙুল, গোল গোল নখ । আমি
যে ভুলতে পারছি না'.'কোনদিনই পারবে! না""“হু-স্ছ করে মনটা
১০৬
পিছিয়ে গেল সেই দিনটিতে "'"চলভ্ত গাড়ির গ্রিয়ারিং হুইলে
মনিকিউর কর! হাত রেখেছে কন্তরী--সেই একই হাত দিয়ে কাপা-
কাঁপা আঙুলে খুলছে আয়নার স্থুদৃ্ঠ মৌড়ক""চোখ খুললাম
আমি। পাশেই শুয়ে রয়েছে অনড় মৃতি। মুহূর্তের জন্যে কান
পেতে শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্ধ শুনলাম আমি । তারপর কন্ুইয়ের ওপর
ভর দিয়ে উঠে ঝুকে পড়লাম অদৃশ্য মুখটির ওপর | আমার ঠোঁটের
ছোয়ায় সামান্য কেঁপে উঠল অদৃশ্য চক্ষুপল্লব।
“কেন বলছে। না তুমি কে? বেদনাঘন কণ্ঠে শুধোই, “সত্যিই
কি তুমি বলবে না, তুমি কে?
চোখ উপচে আবার গড়িয়ে পড়ল উঞ্ণ অশ্রুধারা'“'নোনা-ম্বাদে
কি এত ছঃখ জমেছিল ; কমালটা কই? বালিশের নিচে নেই।
দাড়াও আসছি ।?
খাট থেকে নেমে বাথরুমে গেলাম | ড্রেসিংটেবিলে অন্যান্য
কসমেটিকস্-এর মধ্যে স্ুলতার ভ্যানিটি ব্যাগ থাকে । ব্যাগ খুলে
ভেতরে হাত চালালাম-_নেই রুমালটা। রুমালের বদলে আঙুলে
ঠেকলে। গোল গোল কয়েকট। দানা--নেকলেস। হ্যা, নেকলেসই
বটে। জানলার সামনে তুলে ধরতেই ঘষাকাচের মধ্যে দিয়ে টাদের
মরা-আলো! এসে পড়ল নেকলেসটার ওপর । মুল্যবান পাথরগুলো৷
ওই ফ্যাকাশে আলোতেই জ্বলছে । হাত কাপতে »"গল আমার।
সন্দেহের কোন অবকাশ নেই-_এ নেকলেস উমা দেবীর ।
১১৭
॥ চার ॥
লল্্মীটি, আর খেও না, অনেক হল |;
বলেই, আড়চোখে পাশের টেবিলগুলোয় তাকিয়ে নিলে সুলতা |
না, কেউ শোনে নি| যে যার খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত।
কদিন ধরে আমিও লক্ষ্য করছি, আমর! ছুজনেই যেন একটা
দ্রষ্টব্য বস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছি। বেশি দৃষ্টি আমার ওপরেই | সুলতা
অস্বস্তি বোধ করে। কিন্ত আমি করি না। কাউকেই আর ভয়
করি না আমি।
এক চুমুকে গেলাসট। শেষ করে ঠং করে নামিয়ে রাখলাম
টেবিলের ওপর ; বললাম, “তুমি কি মনে করে। এত সহজে বেহেড
হবে৷ আমি £
না! হলেও এত খেলে শরীর খারাপ হবে না ?
“তা হবে। হলেই বা কার কি? এত মাথাব্যথ। কেন?
কুমীরের চোখে জল দেখলে লোকে বলবে কি?
জালা শুধু আমার 'কথাতেই ছিল না, চোখেও ছিল | চোখে
চোখ রাখতে ন। পেরে মেনু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সুলতা |
ওয়েটার এসে দরাড়াতেই হুকুম দিলে ও, “বাটার কেক । একটা 1,
“আমার জন্তেও একটা, বলি আমি । ওয়েটার এগিয়ে যেতেই
ঝুঁকে পড়ে বললাম, তুমি কিন্ত বেশি খেতে না'" "চার বছর আগে""”
ঠোঁট কেঁপে উঠল আমার; তবুও বললাম, চার বছর আগে কত
সাধ্যসাধন! করেও মিষ্টি খাওয়াতে পারিনি তোমাকে |,
“তার মানে ?
মানে আছে'*'মনে করে দেখো'*"একটু চেষ্টা করে৷ মনে
১১
“আবার সেই গল্প 1
হ্যা, আবার সেইগল্প। জীবনে একবারই আমার সুখী হওয়ার গল্প ।'
দ্রুত নিশ্বাস বইছিল আমার | পকেট হাতড়ে সিগারেট আর
দেশলাই বার করার সময়েও চোখ সরালাম না আমি স্ুলতার
মুখের ওপর থেকে।
“এত বেশি সিগারেট খাওয়াও উচিত নয় অস্পষ্ট স্বরে বলে
স্থলতা |
জানি। সিগারেট খেয়ে ক্যান্সারকে নেমন্তন্ন করছি, তা!
জানি। কিন্তু আমি তো! তাই চাই | মদ খেয়েই যদি আমি মরি--”
সিগারেট! ধরিয়ে নিয়ে জলস্ত কাঠিটা সুলতার চোখের সামনে
নাড়তে নাড়তে বলি, “মদ খেয়েই যদি আমি মরি, তাতেই বা কি
এসে যায়! তুমিও তো একদিন বলেছিলে আমাকে । বলেছিলে,
মরতে আনম।ব ভাল লাগে ।,
নিরুত্তর রইল সুলতা |
“কোথায় বলেছিলে, তাও বলে দিতে পারি পারি আমি । গঙ্গার
ধারে, জল থেকে ওপরে এসে”
বলতে বলতে হেসে উঠেছিলাম | টেবিলের ওপর ছুই কনুই
রেখে সিগারেটের ধোঁয়ায় একটা চোখ ছোট করে কথা বলছিলাম |
ছুটে! বাটার কেক টেবিলে রেখে গেল ওয়েটার।
ছুটোই খেয়ে নাও। আমার হয়ে গেছে!
মিনতি মাখানো! গলায় বলে ওঠে সুলতা, একটু আস্তে বলো।
সবাই তাকিয়ে আছে এদিকে ।”
“তাকাক না? আমার ক্ষিদে নেই--এ কথাটাঁও জোর গলায়
বলতে পারব না? কি মুশকিল!
“আজ তোমার কি হয়েছে বলে। তো ?
“কিস্ম্র হয় নি--"চামচ দিয়ে খাচ্ছো না কেন? আগে তে!
সেই ভাবেই খেতে ?
১০৪১
প্লেটট। সরিয়ে রেখে ব্যাগটা টেনে নিয়ে উঠে দীড়ল সুলত]।
“অসহা ।
সঙ্গে সঙ্গে আমিও উঠে ধাড়িয়েছিলাম | সত্যিই, প্রত্যেকেরই
কৌতুক উচ্ছ্বসিত দৃষ্টি রয়েছে আমাদের ওপর | কিন্তু তাতে আমার
কি? কে কি বলে, কি ভাবে, তা নিয়ে আর মোটেই মাথা ঘামাই
নিআমি | অহোরাত্র যে বিষের জ্বালায় ছটফট করছি, তার অংশ
যখন ওর! নিতে পারবে না, তখন পরোয়া কিসের ?
সিঁড়ির গোড়াতেই ধরে ফেললাম স্ুলতাকে | পাশ দিয়ে
একজন ওয়েটার নেমে যেতে যেতে অপাঙ্গে তাকিয়ে গেল আমার
দিকে । রুমাল দিয়ে চোখ মুছে নিলে স্ুলত।| বড় তালে! লাগল
আমার । কাদলেই হুবন্থু কস্তরী হয়ে ওঠে স্থলতা। আর কোন
তফাৎ থাকে না। নিঃশব্দে সি'ড়ি বেয়ে উঠে এলাম ছজনে। ঘরে
ঢুকে স্থুলতা বিছানার ওপর ছুড়ে দিলে ব্যাগটা ।
“এভাবে থাকতে পারব না আমরা"".দিনে রাতে সর্বক্ষণ এক
কথ ''যা জানি ন। তাই নিয়ে আমাকে একন।গাড়ে খুঁচোনো৷ সত
সত্যিই অসহ্য হয়ে উঠেছে আমার কালই চলে যাবো আমি-""
নইলে পাগল করে ছাড়বে তুমি-*"
কাদছিল সুলতা অশ্রুর পাতলা স্তরের নীচে চিকমিক করছিল
কাজল-কালে। ছুই চোখ |
বললাম, শ্যামনগরে নীলকুঠির সামনে সেই বুরুজটা মনে
পড়ে ?...চোখ বুজে হাটু গেড়ে বসেছিলে তুমি-.তারপর যখন উঠে
্লাড়ালে, মুখট। ফ্যাকাশে হয়ে গেছেল-_ঠিক আজকের মত ।"
ধপ করে বিছানার কোণে বসে পড়ল সুলতা | ফিস ফিস করে
শুধোলে, শ্যামনগর ?
হ্যা, শ্টামনগর-*'মরতে বসেছিলে তুমি ?
“মরতে বসেছিলাম ?**আমি ?
আচম্িতে শয্যার ওপর মুখ গু'জড়ে আছড়ে পড়ল সুলতা ।
১৭২০
কান্নার ধমকে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল তম্বীদেহ। পাশে বসে
মাথায় হাত বুলোতে যেতেই সরে গেল ও |
ছুয়ো না আমাকে” কান্নায় তেজ বিকৃত স্বর
আমাকে তয় ?
হ্যা, তোমাকে, তোমাকে, তোমাকে |:
“মাঁতলামির জন্টে £
'না।'
“তবে?
সব চুপ।
“আমি উন্মাদ, তাই না?
না
উঠে দাড়ালাম আমি । কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পাবিনি ।
তাবপর বলোঁছলাম বিড়বিড় কবে, 'অসম্ব নয়-'হলেই বা কি এসে
যায়'-আচ্ছা, ওই নেকলেসটা.'"না, না, বলতে দাও আমাকে",
নেকলেসট গলায় দাও না কেন ?
ভাল লাগে না বলে- আর কতবাব বলতে হবে ?
তাল লাগে না? না, পাছে আমি ধবে ফেলি---কোন্টা সত্যি ?
“ভাল লাগে না।'
“একগল। গঙ্গাজলে দাড়িয়েও যদি বলো। একথা *" জুতো দিয়ে
কার্পেটে দাগ টানতে টানতে বলি, “নিশিকান্ত শর্মার উপহার, তাই
না?
কন্ুইয়ের ওপর ভর দিয়ে উঠে খাটের ওপর ছুই পা! তুলে নিলে
লতা | বললে, “নিশিকান্তবাবুর কাছে শুনেছিলাম, চায়না টাউনের
একট। দোকান থেকে নেকলেসট। কিনেছিলেন উনি।
“কতদিন আগে ?
তাও বলেছি তোমাকে । বার বার একই কথা কেন বলাচ্ছে।
বলো তো?
১২১
প্রেত-প্রেয়সী--৮
“কতদিন আগে ?
“ছ-মাস ।;
“মিথ্যে কথ! ॥;
“মিথ্যে বলে আমার লাভ ?
স্বীকার করে নিলেই সব গোল চুকে যায়। তুমিই কপ্তরী
'কৌশিক |;
না। দোহাই তোমার, ও-নাম আর শুনিও না। আমি আর
পারছি না। সে মেয়েকে এখনও যদ্রি তুমি এতই তালবাসো। তে!
আমাকে রেহাই দাও...কালই বিদায় নেবো! আমি" "যথেষ্ট হয়েছে,
সহ্যের সীমা আমার ছাড়িয়েছে
“সে মেয়ে" "মারা গেছে, আর'**
কথা ফুটছিলে! না গলায়, কাশতে গিয়ে গল! জলে গেল । তবুও
বললাম,“মার! গেছিল: .'কিছুদিনের জন্যে'* তাও সম্ভব | কি বলো?
“ন11” অব্যক্ত বেদনায় যেন গুঙিয়ে ওঠে স্বলতা | “দোহাই
তোমার | থামো।
আবার আতঙ্কের একট! ফিনফিনে মুখোশ ছলে ওঠে সুলতার
আবেগ থর-থর মুখের ওপর ।
সবে গেলাম আমি |
বললাম, “ভয় পেও না। তুমি তে। জানো, তোমাকে আঘাত
দিতে আমি চাই না "মাঝে মাঝে অদ্ভুত অদ্ভুত কথ! বলি বটে, কিন্তু
সে তে আমার দোষ নয়--'ছ্যাখে। তো, চিনতে পারো ?
ফস করে পকেট থেকে ঝকমকে আয়নাট। বার করে ছু'ড়ে দিলাম
শধ্যার ওপর | যেন সাপ দেখেছে এমনিভাবে তয়ার্ত চীৎকার করে
কুঁচকে সরে গেল সুলতা ।
গ্যাখোও স্কাখো'' ভালো করে গাখো! হাত দাও" নাও" সাপ
বিছে তো নয়, সামান্য একটা আয়না". 'কামড়াবে নাঃ তয় নেই."
কী? মনে পড়ছে কিছু?
১২২
না)
“মিউজিয়ামে যাওয়া ?'
না
“তোমার লাশের পাশ থেকে তুলে নিয়েছিলাম এই আয়না""*
অবশ্য তা তোমার মনে পড়বে না।:
চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিলাম শেষের কথাগুলো।। আবার ঝরঝর
করে কেদে ফেললে সুলতা |
“সরে যাও."-সরে যাও সামনে থেকে--'একল। থাকতে দাও
আমাকে ॥
একই স্বরে বলি আমি, “রেখে দাও--এ জিনিস তোমার 1,
অশুভ নক্ষত্রের মতই ছুজনের মাঝে থেকে চিকমিক করতে
লাগল আয়নাটা। ওপাশে স্ুলতার তয়করুণ মুখ দেখে অকস্মাৎ
বুকট! টনটনিয়ে উঠল আমার | একি করছি আমি? মিছিমিছি
কেন যন্ত্রণায় নীল করে তুলছি ওর মনকে? কিন্ত সত্যিই কি
মিছিমিছি ?
দপদপ করে উঠলো রগের শিরাগুলো। সোরাই থেকে এক
গেলাস জল গড়িয়ে নিয়ে এক চুমুকে শেষ করে দিলাম। এখনও
শেষ হয় নি প্রশ্নের তৃণ...আরও অনেক প্রশ্রশর নিক্ষেপ করে ক্ষত-
বিক্ষত করে তুলতে হবে ওর বিস্মৃত মনকে.*'তবেই যদি * তবেই
যদ্দি '*কিস্ত তার আগে আবার সহজ করে তুলতে হবে কন্তুরীকে।
ভয়ে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেছে বেচারী-.-একটু একটু করে মুছে
দিতে হবে ওর আতঙ্ক''তারপর ? *"তারপর স্ুলতার রক্ত-মেদ-
মজ্জার মধ্যে আবির্ভাব ঘটবে কন্তুরীর। দরজায় ছিটকিনি তুলে
দিলাম আমি ।
“আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে যেতে দাও 1; ককিয়ে উঠল
সুলতা |
“কোথায় যাবে ”
“যেদিকে ছচোখ যায়|,
“আমি আর তোমাকে ছোবে। না সুলতা, কথ। দিচ্ছি'*.অতীত
নিয়ে আর কোনো কথাই বলবো! না।,
দ্রুত নিশ্বাস বইছিল স্থলতার। পেছন ফিরে জাম। খুলতে
খুলতে বেশ বুঝলাম । একদৃষ্টে আমার পানে তাকিয়ে আছে ও।
ফিরে দাড়াতেই আবার কান্নায় তেডে পড়লে সুলতা। “তোমার
পায়ে পড়ি--চোখের সামনে থেকে সরাও আয়নাটা |,
'রাখবে ন। তুমি ?
না। একটু শান্তিতে থাকতে দাও আমাকে । আমি আর
পারছি না..'আর পারছি না।?
মমতায় তরে উঠলে! সমস্ত মন। পাশে গিয়ে বললাম,
“কাদছে। কেন, কন্তুরী 1? তোমাকে কাদানোর সত্যিই কোন ইচ্ছে
নেই আমার । আলতো হাতে চোখের জল মুছতে মুছতে গাটম্ববে
বললাম, “কেদে না কন্তরী-'.কেঁদে। না" কেন কাদছো ?
বুকের মাঝে মাথা টেনে নিলাম ওর। নিবিড প্রেমে ধীবে
ধীরে দোলা দিতে দিতে বলতে লাগলাম ফিসফিস স্বরে,মাঝে মাঝে
কি যে করি, নিজেই বুঝি না ' ভুলতে ন। পারাব যন্ত্রণা যে কত
মর্মীস্তিক, তোমাকে বোঝাতে পারব না'""পাচজনের মত ওর
স্বাভাবিক মৃত্যু হলে হয়তো এত কষ্ট পেতাম না আমি-'হয়তে!
এতদিনে ভুলেও যেতাম ''কিন্ত'''আজ তোমাকে বলতে পারি-**
আত্মহত্যা করেছিল কন্তুরী। বুরুজের ওপর থেকে লাফিয়ে পডে
এ পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছিল কস্তরী। কিন্তকেন? কেন আমাদের
সবাইকে ছেড়ে যাওয়ার জন্যে মরিয়! হয়ে উঠেছিল-"-চার বছর ধবে
একনাগাড়ে এই একটি মাত্র প্রশ্নের উত্তরের আশায় পাগল হতে
বসেছি আমি ।'
উত্তরে একটা চাঁপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল সুলতা বুক ঠেলে।
“পব কথাই বললাম তোমাকে | তুমি আমার...তুমি আমার
১২৪
"ভাল তাকে আমি এখনও বাসি, বাসব। তোমাকেও বাসি।
ছুটো৷ তালোবাসাই যে এক...কোন তফাৎ নেই । তালো৷ আমি
একজনকেই বেসেছি--ছুজনকে নয়। তুমি যদি একটু চেষ্টা করো
'“ওগো। একটু চেষ্টা করো মনে করতে, তাহলেই”**
সুলতার মাথা নড়ে উঠল আমার বুকের ওপর | আরে! জ্রোরে
চেপে ধরে বললাম, “না, না, শেষ করতে দাও"""গত কদিনে আমি
যা অন্থুভব করেছি, সমস্ত সত্তা দিয়ে উপলব্ধি করেছি-_ত৷ বলবার
স্থযোগ আমাকে দাও ।,
হাত বাড়িয়ে বেডল্যাম্পট। নিভিয়ে দিলাম । একাস্ত নিবিড়
হয়ে বসেছিলাম ছুজনে *ভেসে চলেছিলাম অন্ধকারের নিঃসীম
দরিয়ায়'-একটু সোজ। হয়ে বসতে পারলে ভালে হত-*-টনটন
করছিল হাতটা, কিন্তু নড়তে সাহস হল না আমার"নিরন্ত্র তমিস্রায়
বিলীণ হয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে চললাম, "মরতে আমি বড়
ভয় পাই ছেলেবেলা থেকেই * এই ভয় আমার আছে.**অপরকে
মরতে দেখলেও আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে গেছি আমি'*'ছেলে-
বেলায় রাত্রে হরিবোল চীৎকার শুনে আতকে উঠে ঘুমের
ঘোরেই জড়িয়ে থাকতাম মাকে"*'জীবনে শ্বাশানে যাই নি ভয়েতে
'**কখনো ভেবেছি সব সত্যি- "কখনো ভেবেছি সব মিথ্যে'-"
কিন্ত আজ আর কোন দ্বিধা আমার নেই...তোমার মধ্যেই
জেনেছি, কিছুই মিথ্যে নয়, সব সত্যি-'ওগো, কথা কও...
একটি বারের জন্য তুমি যদি বলো, স্বীকার করো'"'তাহলে
চিরকালের মত জুড়িয়ে যায় আমার জলে-পুড়ে খাক হয়ে-যাওয়া
মনটা |;
অন্ধকারের মধ্যে অন্ধকার দিয়ে গড়। সুলতার মুখে মনে হল
কোন চোখ নেই। শুধু কপাল, গাল আর চিবুকের রেখ৷ দেখা
যাচ্ছিল ম্লান আতায়। পরিপূর্ণ তালবাসায় স্গিপ্ধ হয়ে উঠেছিল
আমার দগ্ধ অস্তর | একদৃষ্টে শুম্ত অক্ষিকোটরের দিকে তাকিয়ে
১২৫
ভেবেছিলাম বসন্তের বাতাসের চেয়েও হাক্ক। স্বরে জবাব দেবে
কন্তুরী, বলবে এমন একটি কথা **
ঘন গলায় বললাম, “লক্ষ্মীটি, ওভাবে তাকিয়ে থেকো না কিছু
বলো ।;
ডান হাতট। অবশ হয়ে গেছল আমার । শুধু হাত কেন, পুরো
ডান দিকটাই অসাড় মনে হচ্ছিল। মনে পড়ল, গঙ্গার বুক থেকে
টেনে টেনে কন্তরীকে তুলে আনার দৃশ্ঠটি। কিন্ত আজকে আর
জীবনের জন্য কোন সংগ্রাম নয়'"'আজ আমি চাই নিজেকে নিঃশেষে
ঈপে দিতে এমন একজন নারীব হাতে-_রহস্তের চাবীকাঠির অন্ধান
যে জানে ৬৬
ঘুম পাচ্ছে''-চিন্তাধারাও আর স্বচ্ছন্দ নয়'' এলোমেলো" "কথা
বলতে চাইলাম*'পারলাম না-" রাশি বাশি কুয়াশায় ঢাকা পড়ে
গেল সবকিছু **
ভোরবেলা ঘুম ভাঙতে অনাবিল শান্তি অনুভব করলাম । মনে
হল, আর কোন সমস্যা, যন্ত্রণা আমার নেই। কন্তবী বড় বড় চোখ
মেলে অপলকে তাকিয়েছিল আমার পানে । দেখতে দেখতে অশ্রু
টলমল করে উঠল কালে দীঘিব মত ছুই চোখের কানায় কানাঁয়।
উঠতে গিয়ে ' অনুভব করলাম মাথায় যন্ত্রণা । হুইক্চিব
প্রতিক্রিয়৷ | কনুইয়ের ওপর আধশোয়া অবস্থায় দেহ ছেড়ে দিয়ে
বললাম, “স্থলত। !
“বলো, কান্নায় ভেজা স্বর ।
"সত্যিই আমাকে ভালবাসো তুমি ?
কোন জবাব নেই ।
“আচ্ছা, ঘুমের ঘোরে নিশ্চয় আবোলতাবোল বকেছি আমি,
তাই নয়?
শাড়ির আচল দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে সুলতা বললে, “না, কিছুই
বলো নি। কিন্তু কথা পরে, আগে বাথরুম থেকে ঘুরে এসো ?
১২৩
তোমার ??
আমার হয়ে গেছে, চুল ভিজে দেখতে পাচ্ছে না ?
স্বলিত চরণে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করার সময়ে দেখি,
তখনও আশ্চর্য গভীর দৃষ্টি মেলে আমার পানে তাকিয়ে আছে
সুলতা |
কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এসে দেখি, আয়নার সামনে বসে চুল
আচড়াচ্ছে ও।
চোখ ছোট করে লক্ষ্য করতে লাগলাম কেশচর্চা। অনেক
রোগ! মনে হচ্ছে স্ুলতাকে। তবে কি আমার চাইতেও বেশি
নিগ্রহ ভোগ করছে ওর আত্মা? খোপা বাঁধতে শুক করতেই
আবার নিজেকে সামলাতে পারলাম না-হাঁত থেকে ছিনিয়ে নিলাম
চিরুনিট! £ “দাও আমাকে-_ওভাবে নয় |!
একটা চয়ার টেনে বসলাম ঠিক পেছনে ।
«এ খোঁপা মোটেই মানীয় না তোমায়--আমি দেখিয়ে দিচ্ছি |?
হাক্কা সরে বললেও গল। কেঁপে গেল আমার । অধীর
উত্তেজনায় কীপতে লাগল আগঙুল। ভারি মিষ্টি একটা সৌরভ
উঠছিল চুল থেকে, অজান! সুবাস, কিন্ত নিমেষে হাঁক্কা হয়ে যায়
মনটা | বুক তরে শ্বাস নিয়ে দেখি, জকুটি করে তাকিয়ে আছে
স্থলতা। মুক্তার মত দাত দিয়ে চেপে ধরেছে অধর। কিন্তু বাধা
দিলে না| জানে, বাধা দিয়ে কোন লাত নেই, তাই বুঝি
নিঃশেষে ছেড়ে দিলে নিজেকে আমীর খেয়ালের হাতে | আস্তে
আস্তে একপাশে কাধের ওপর রূপ পরিগ্রহ করতে লাগল বিচিত্র
খোপাটা। কাটার পর কাটা লাগিয়ে চললাম আনাড়ি হাতে । বহু
দিবস, বহু রজনীর মধ্যে দিয়ে জাগরুক স্মৃতিপটে আকা সেই
মুখটিকে ফুটিয়ে তুলতে চাই আমি-_শিল্পীর মত রঙের পর রঙ
চড়িয়ে ক্যানভাসের বুকে আমার মানসীকে- ধ্যানের কন্তরীকে।
আশ্চর্য | সত্যি সত্যিই ফুটে উঠে যে সেই মুখ-যে মুখের
১২৭
স্বৃতি নিয়ে উদভ্রান্ত হতে বসেছি আমি ! ওই তে। সেই চারুললাট,
নিখুত কর্ণযুগল ! শেষ কীটাট। গু'জে দিয়ে ঘাড় কা কবে তন্ময়
হয়ে রইলাম আমার স্ষ্টির পানে ।
সার্থক আমার প্রচেষ্টা | দর্পণের বুকে সোনালি রোদের মাঝে
জলরঙে আক ছবির মতই স্পষ্ট, নিখু'ত অথচ পাংশু এ মুখের রহস্ত
আজও আমার কাছে অজ্ঞাত।
'কম্তরী !
অস্ফুট স্বরে অজ্ঞাতসারেই চিৎকার করে উঠেছিলাম আমি ।
কিন্তু কন্তরী তা শুনতেই পেলে! না। তবে কি দর্পণের বুকে আমি
যা দেখছি তা! প্রতিবিষ্ব নয়, জীবন্ত ? না, মরীচিকা, চোখের মায়া ?
চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘুরে গিযে সামনে থেকে দেখলাম আমি । সেই
মুখ। না, ঠকি নি আমি-_এ সেই কন্তরীই বটে।
আমার মর্মভেদী, এবং সম্ভবত উদ্ভ্রান্ত, দৃষ্টির সামনে বুকের
পাঁজর খালি করে দিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুলতা | হাসবাৰ চেষ্টা
করল ; বলল, “আর কিছুক্ষণ পরে তো ঘুমিয়েই পড়তাম” তারপর
আয়নার বুকে একঝলক চোখ ঝুলিয়ে নিয়ে বলল, “মন্দ কি, নতুন
ফ্যাশান | তবে ক" সেকেও্ড থাকে, সেইটাই প্রশ্ব ।
বলে, মাথার এর ঝাকুনিতেই এদিকে ওদিকে ছিটকে পড়ল
কাটাগুলো, কালে! মেঘের মত চুলের রাশি ছড়িয়ে পড়ল পিঠেব
ওপর | হাসতে হাসতে আমার গায়ে গড়িয়ে পড়ল সুলতা |
আমিও হাসলাম। হেসে স্বস্তি বোধ করলাম |
সূর্য যখন মধ্যগগনে, তখনও মাথা টিপে দিচ্ছিল সুলতা । এবার
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে টপ করে উঠে পড়ে বলল, চলো |,
সচমকে বললাম, “কোথায় ?
মুখ টিপে হেসে জবাব দিলে সুলতা “খেতে হবে না?
“তুমি যাও." আচ্ছা» চলো'"'কিন্তু মাথার যন্ত্রণা"
১২৮
শীস্ত সুন্দর দৃষ্টি মেলে ধরলে সুলত! £ "ভয় কিসের, আমি তে৷
চলে যাচ্ছি না"**তোমার খেতে ভাল না লাগলে শুয়ে থাকে! ।
এখুনি আসছি আমি।
আমার অবচেতন শঙ্কার জবাব দিয়েছে স্বলতা। শরীরটা
সত্যিই ভাল নেই। মাথায় অসহ্া যন্ত্রণা-*.কিস্ত স্ত্রী যদি না
আসে? মিথ্যে তয় '"মরিয়া হয়ে বললাম, “ন॥ ভয় কিসের । যাও
তুমি, তাড়াতাড়ি এসো 1,
সত্যি বলছে?
হ্যা, সত্যি । যাও আমি বলছি যাও ।,
দরজাটা বন্ধ হয়ে যেতেই আবার নিদারুণ উদ্বেগে ঠোট কামড়ে
ধরলাম আমি | জানি, বৃথা আমর এই শহ্।। ওর সব জিনিসই
রয়েছে এ-ঘরে'*'সব ছেড়ে কি কেউ যেতে পারে ? অসম্ভব !
[ঝশ হায়রে অনুঝ মন! সেকেণ্ড কয়েক পরেই মনে হল,
আমি সব পেয়েও আবার সব হারাতে বসেছি । সঙ্গে সঙ্গে আতীব্র
বেদনায় ছটফটিয়ে উঠে দ্রাড়িয়েছিলাম আমি । আলনা থেকে
জাম! টেনে আর কিছু না! ভেবেই তরতব করে নেমে এলাম সিড়ি
বেয়ে।
খাবার ঘবের দরজার আড়ালে দ্রাড়িয়ে উকি দিলাম ভেতরে ।
ধক্ করে উঠল বুকট1।
স্থলতা নেই তেতরে । উত্তাল হৃৎপিগটা মনে হল, এইবার বুঝি
বিকল হয়ে যাবে। রুদ্বশ্বাসে দৌড়ে এসেছিলাম প্রধান তোরণে |
রাস্তাটা সৌজ। গিয়ে যেখানে মোড় নিয়েছে ডান দিকে, ঠিক
সেইখানে দেখা গেল হনহন করে এগিয়ে চলেছে একটি মৃতি।
বাদামি শাড়িটি আটসাট করে জড়ানে। তম্বীদেহে । প্রতি পদক্ষেপের
সঙ্গে সঙ্গে যে হিল্লোল উঠছে পা! থেকে মাথা পধন্ত--তার প্রাতিটি
আমি চিনি। প্রখর স্ূর্যালোকে দীর্ঘ চার বছর পরে ফিরে আসা
কন্তুরী কৌশিক অদৃশ্য হয়ে গেল পথের মোড়ে।
১২০)
নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আমার ; কুয়াশার পর্দা ছলে ছলে উঠছে
চোখের সামনে | আমি কি মূছণ যাবো 1 না, না, আমাকে যেতে
হবে, এগিয়ে যেতে হবে। পিছু নিতে হবে ওই রহস্যময়ী
নারীমূত্তির-_জীবন আর মৃত্যুর মধো দোলকের মত নিরন্তর রয়েছে
যার আসা-যাওয়।।
ছুটে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমি রাস্তায় মোড়ের মাথায়
এসেই আবার দেখতে পেয়েছিলাম সেই শরীরী প্রহেলিকাকে।
ক্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে সে যেদিকে, সেদিকে এর আগে
ওকে আমি কোনদিন আসতে দেখিনি । কিন্তু পথঘাট তার
নখদর্পণে | সমানে লেগে রইলাম পেছনে । পলকের মধ্যে যেন
মিলিয়ে গেছে মাঝের চারটি বছর | পুরোন দিনে ফিরে গেছি
আমি-_পিছু নিয়েছি কস্তরী কৌশিকের | নতুন করে কোষে কোষে
অন্ুতব করলাম সেই অবর্ণনীয় উত্তেজনা আর শিহরণ । কন্তরী--"
কন্তুরী "-কন্তরী'..স্মৃতির পাতা থেকে উঠে আসা কন্তরী ওই তো
এগিয়ে চলেছে সামনে'*'অভ্যস্ত চরণে এ-পথ ও-পথ ঘুরে এসে
চকিতে অন্তহিত হয়ে গেল সে একট] দোতল। বাড়ির মধো ।
থমকে ফাড়ালাম আমি | এক মিনিট-..ছু মিনিট:..পাঁচ মিনিট
কেটে গেল- কিন্তু কাট্রকেই বাইরে আসতে দেখলাম না ।
হুর দুরু বুকে এগিয়ে গেলাম কাছে- ছোট্ট ফলকটা চোখে
পড়ল তখনই--সাঁদার ওপর কালো হরফে শুধু ছটি শব্দ দ্রর্গ
হোটেল? ।
মুহূর্তের জন্যে ইতস্তত করেছিলাম । তারপরেই লম্বা লম্বা পা
ফেলে ঢুকলাম ভেতরে-_সোজা গিয়ে দাড়ালাম টেবিলের ওপাশে
গান্ধী-টুপি-পরা ছোকরার সামনে ।
“এই মাত্র যে তদ্রমহিল! এলেন, ওঁর নামটা জানতে পারি ?,
“উম। দেবী | কিন্তু কেন বলুন তো?
১৩৩
॥ পাচ॥
সুতা যখন ফিরে এল, আমি তখন চিৎ হয়ে শুয়ে খাটের ওপর |
“বড্ড দেরি হয়ে গেল। রাগ করো নি তো?
না, রাগ করবে। কেন |
শরীর কিরকম ? মাথার যন্ত্রণা কমেছে? পাশে বসে মাথায়
হাত বুলোতে বুলোতে বললে সুলতা ।
উত্তপ্ত মাথাট। যেন জুড়িয়ে গেল শীতল করস্পর্শে।
বললাম, কই আর কমলো । আসপিরিন খেয়েও কিছু হচ্ছে
না।?
'আসশিরিন খেয়ে আকাশপাতাঁল তাবলে কি মাথা সারে।
একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো | আমি বরং একটু ঘুরে আসি ।
সচকিত হয়ে শুধোলাম, “কোথায় ?
“ল্ো-টা ফুরিয়েছে । আরও ছু একটা জিনিস কেনা দরকার ।
যাবো আর আসবো ।
চুপ করে রইলাম । কি জবাব দেব? এইমাত্র যা দেখে এলাম,
য শুনে এলাম, তারপরেও কি স্ুুলতাকে চোখের আড়াল করা
উচিত?
চুলের মধো আঙুল চালাতে চালাতে সুলতা বললে, “কিছু
বলছে! না৷ কেন? যেতে দিতে মন সরছে ন! বুঝি ?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “স্থলতা, আমাদের পরস্পরের কাছে
কে যে বন্দী, আর কে মুক্ত, তা তুমি ভালো করেই জানো | কাজেই
তুমি যেতে চাইলে আটকে রাখার ক্ষমতা তো আমার নেই ।,
কথাটার অর্থ অনেক। কিন্তু যেন কিছু না বুঝেই সরল চোখে
বললে সুলতা, “ও কথা! বলছে! কেন ?
১৩১
“বড় ভয়, স্থলতা, বড় ভয়। যদি বুঝতে".
উঠে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসল সুলতা | বললে,
“তোমার এই অন্ুখ শুধু ভয় থেকেই। ভয়টাকে জয় কবতে পারো
না?
চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণ নিঃশব্ধে কেটে গেল। শুধু চুড়ির
রিনিঝিনি শব আর চিরুনি । কাঁটা রাখার আওয়াজ থেকে বুঝলাম
প্রসাধন নিয়ে তম্ময় হয়ে রয়েছে সুলতা | বড় নিঃসহায় মনে হলো!
নিজেকে । হুর্গী হোটেলে উম! দেবীর আঁবি9ভ্ভাবের পর থেকেই যেন
একটা ছুর্ভেছ্ঠ অদৃশ্য প্রষচীর উঠে গেছে আমাদের মধ্যে । আরও
অবোধ হয়ে উঠেছে সুলতা |
টুল সরানোর শব্দ শুনলাম। তারপরেই পায়ের আওয়াজ
এগিয়ে এলো । পরক্ষণেই ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম আমি ।
সামনেই দাড়িয়ে কস্তররী। কাধের ওপব বিচিত্র ফ্যাশনের
খোঁপা । হাক্কা লিপম্টিকে উজ্জ্বল ধারালে। অধরোষ্ঠ। সারা মুখে
ঝকমক করছে এক ছুবোধ্য হাসি - মোনালিসার হাসি।
বাক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার । বিক্ষারিত দৃষ্টি মেলে
দেখছিলাম সেই নাপীমূন্তিকে, দীর্ঘ চার বছব যার স্মৃতি (নিয়ে উন্মাদ
হতে বসেছি আমি | .
“ভাল লাগছে তোমার ? অদ্ভুত সুরে শুধোলো সুলতা ।
প্রত্যুত্তরে গল! দিয়ে খানিকট। ঘড় ঘড় শব্দ বেরোলো-_ কথা৷
ফুটলে। না।
“আমাকে এইভাবে সাজাতে তোমার ভাল লাগে- তাই এই
খোপাই বাধলাম | ঠিক হয় নি?
হয়েছে অবরুদ্ধ কে বলি আমি |
“তাহলে আমি যাচ্ছি ।,
ধড়মড়িয়ে উঠে বসি আমি, 'তুমি-""তুমি-ং ফিরে আসবে
তো?
১ ৩৭২
বিলোল কটাক্ষ হেনে জবাব দিল স্থুলতা, “ছেলেমানুষি করো
না। ফিরে আসবে না তো যাবো কোন্ চুলোয় ?
বন্ধ হয়ে গেল দরজা |
শূন্য ঘরে অতিভূতের মত বসে রইলাম আমি । সমস্ত" মাথাট।
লোহার মত তারী মনে হচ্ছে । যেন ছিড়ে যাচ্ছে প্রতিটি স্নায়ু
এমনি যন্ত্রণা। কিন্ত একি করলাম আমি? এইমাত্র যে রূপসী
বিদায় নিয়ে গেল বিচিত্র হেসে--তাকে তো এর আগেও একবার
হারিয়েছি নিষ্ঠুর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে--.এ বিদায়ও কি শেষে." না"**
না...আমি যেতে দেবো না--"যেতে দেবে। না-"-কিছুতেই চোখের
আড়ালে যেতে দেবো না
মাথার যন্ত্রণা ভূলে গিয়ে বিদ্যুতৎবেগে উঠে পড়লাম শয্যা ছেড়ে ।
তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে রাস্তায় পড়ে দেখেছিলাম ধীর
পদক্ষেশে কগ্তরীকে এগিয়ে যেতে ।
অলস চরণে অনেকক্ষণ হেঁটেছিল কস্তুরী। একটা মনিহারী
দোকানে ও ঢুকেছিল। তারপর আবার শুরু হয়েছিল পথপরিক্রম]।
শহরের এদিকে কোনোদিন আসার সুযোগ হয় নি আমার । রাশি
রাশি ড্রামের পাহাড়। বাঁশ আর শাল কাঠের আঁড়ৎ। মাঝে
মাঝে মোষের খাটাল । কোথাও থামলো না কন্তরী। সব কিছু
পেরিয়ে এসে দাড়ালে। একটা মস্ত পুকুরের সামনে ।
ক্ষিপ্তের মত পেছন পেছন আসছিলাম আমি। ধাক! খেয়ে
পথচারিরা সবিম্ময়ে তাকিয়েছে, গালি দিয়েছে, সশব্দে ব্রেক কষে
বাপান্ত করেছে মোটর ড্রাইতার-_কিস্তু কিছুতেই ভ্রাক্ষেপ করিনি
আমি । মাথার যন্ত্রণায়, উদ্বেগে আতঙ্কে মুহামানের মত ছুটে চলে-
ছিলাম । কোথায় চলেছিলাম, সে খেয়াল ছিল না। পুকুরের
সামনে এলে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
এ যেন সিনেম। দৃশ্যের মত অতীতের পুনরাবৃত্তি। এমনি করেই
তো কন্তরীর পিছু নিয়ে কখনও তাকে দেখেছি হুধসাগরের তীরে
১৩৩
ধাড়িয়ে থাকতে, কখনও গঙ্গার পাড়ে পায়চারি করতে । দৃশ্য হুবহু
এক হলেও উদ্দেশ পালটেছে। চার বছর আগে কন্তরীকে হারানোর
ভয়ে তাকে চোখে চোখে রাখার ব্যবস্থা করেছিল মহেল্র কৌশিক |
আর চার বছর পরে সে ভয় আমাকেই প্রায় উম্মাদের পর্যায়ে এনে
ফেলেছে । আজকের পিছু নেওয়া শুধু আমার জন্যেই-__মহেন্দ্রর
জন্যে নয়। একই নাটকের বিচিত্র পুনরাবৃত্তি-"-কিন্ত ওকি ?
পুকুর পাড়ে ঘাস জমির ওপর ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে ফেললে
কম্তরী। তারপর এক তা কাগজ আর একটা ফাউণ্টেন পেন বার
করে ঝুঁকে পড়লে। কাগজের ওপর । মিনিট পাঁচেক পরে কলম
মুড়ে ভাজ করে একটা খামের মধ্যে রেখে উঠে দাড়ালো ও।
গঙ্গার তীরেও এমনিভাবে চিঠি লিখে এসে দীড়িয়েছিল কম্তরী |
টুকরো টুকরে! কাগজ ছড়িয়ে পড়েছিল তাগীরঘীর জলে." 'তারপর-""
আর ভাবতে পারলাম না। কিরকম যেন হয়ে গেলাম।
মরিয়ার মত ছুটে যেতেই দারুণ চমকে ঘুরে দাড়ালো স্থবলতা ।
চিঠিট। ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না। হাত
ফসকে গিয়ে হাওয়ার টানে খামটা গিয়ে পড়লো পুকুরের জলে।
হাপাতে হাপাতে ঘুরে দাড়ালাম আমি । চোয়ালেব হাড় শক্ত
করে শুধোলাম, “কি লিখেছিলে চিঠিতে ?
দৃপ্ত তঙ্গিতে মুখ টিপে দাড়িয়ে রইলো সুলতা, কোন জবাব
দিল না|
“আমাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছিলে, তাই না?
যা
“কিন্ত কেন? কেন!
“আর সহা করতে পারছি না আমি। আর বেশি দিন এভাবে
থাকলে পাগল হতে হবে আমাকে ?
“চিঠিটা পোস্ট করবার পর কি করবার মতলব এটেছিলে ?
ছুহাতে ওর কাধ ধরে ঝাকানি দিয়ে শুধোই আমি।
১৩৪
“চলে যেতাম-''কালকেই যেতাম-**ঃ
“আর আমি?
জবাব দিলে না সুলতা |
আচমকা উত্তেজনার পরেই অবসাদ আসে । আমারও টি
যেন তেডে পড়তে চাইলে! । ক্লান্ত স্বরে বললাম, চলো, ফেরা যাক ।*
কাদা প্যাচপেচে সঙ্থীর্ণ রাস্তা ধরে চললাম আমরা । শক্ত
মুঠিতে স্থুলতার কব্জি চেপে ধরেছিলাম আমি- প্রণয়ীর মত নয়-_
পুলিসম্যানের মত। একটা সুন্্ম তৃপ্তি অনুভব করছিলাম মনে
মনে। কন্তরীকে আমি আবার ফিরিয়ে এনেছি মৃত্যুর উপত্যকা
থেকে।
তুমিই কন্তুরী । তাই নয়?
না।
“এ পশের জবাব পাওয়ার অধিকার আমার এসেছে । আমি
বলছি, তুমিই কন্তরী, তুমিই জনা |
“না|
“তবে তুমি কে?
“লতা মিত্র |?
“মিথ্যে কথা |,
“না, মিথ্যে না,
বাশ আর শাল কাঠের আড়তের ফাক দ্রিয়ে নীল আকাশের
ফালি দেখা যাচ্ছে। ইচ্ছে হলো, গলা টিপে ধরি কন্তরীর'-.
শ্বীসরোধ করে দিয়ে শেষ করে দিই সব কিছুর
“তুমিই কন্তরী। প্রমাণ_ছুর্গী হোটেলে গিয়ে খাতায় নাম
লিখিয়েছিলে--উম। দেবী |”
“লিখিয়েছিলাম শুধু তোমার চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে ।'
“চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে? অর্থাৎ যাতে আর তোমাকে
কোনদিন খুঁজে না পাই ?
১৩৫
হ্যা'*ন্তাই। তোমার যখন দৃঢ় বিশ্বাস যে আমিই উম! দেবী,
তখন আমি উধাও হলে ওই নামেই খোঁজ নিতে তুমি। তাহলেই
খুঁজে পেতে উম! দেবীর নাম "উধাও হয়ে যেতো স্বলতা মিত্র".
সুলতা মিত্রকে ভুলে গিয়ে যাতে কন্তরী কৌশিকের স্মৃতি নিয়ে তুমি
থাকতে পারো- সেই ব্যবস্থাই করছিলাম অ।মি |,
কস্তরীর মত চুল বেঁধেছো কেন ?
“একই কারণে । শ্লেট থেকে সুলতাকে মুছে ফেলতে চাই।
কন্তরী ছাড়া আর কারো নাম থাকবে না সেখানে |”
“কিন্ত আমি তোমাকেই রাখতে চাই |,
নিশ্চুপ রইল সুলতা !
পালাচ্ছিলে কেন? আমার সঙ্গ কি এতই যন্ত্রণাদায়ক ?
“সত্যিই তাই ।,
“আজেবাজে প্রশ্ন করি বলে?
“হ্যা**-তাছড়ো"*আরও কারণ আছে ]+
“যদি কথ! দিই যে এ নিয়ে আর কোন প্রশ্ন করবো না ?'
হায়রে! কথা দিয়েও কি রেখেছে! কোনদিন ?
শোন-"ন্বীকার করো তুমিই কস্তরী, জীবনে আর এ প্রসঙ্গ
নিয়ে কোন কথা বলব না আমি'*'নতুন করে অন্য কোথাও গিয়ে
ঘর বাঁধব, সুখী হবে ছুজনেই |”
“আমি কস্থরী নই।'
আবার । আবার সেই অসন্য একগু য়েমি !
“চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত তুমি কন্তরী--.কোনখানে
কোন তফাৎ নেই |
ছুতে পারে | কিন্তু দোহাই তোম।র, আমাকে রেহাই দাও"
আমার নিজেরও অনেক ছশ্চিন্তা আছে ।'
“কিসের দুশ্চিন্তা ?'
সব দ্ুশ্চিন্তা কি সবাইকে বলে হান্ধ। হওয়। যায় ?
১৩৬
কাদছে সুলতা । শুধু গলাই ধরে নি, চোখও ভিজেছে | রুমাল
বার করে সযত্বে চোখ মুছে দিলাম ওর |
হোটেলে যখন পৌছোলাম, তখন সন্ধ্যে হয়েছে! আলো
ঝলমল পোর্টিকে। পেরিয়ে ডাইনিং রূমে ওমলেটের অর্ডার দিয়ে
বসে পড়লাম কোণের টেবিলে |
সুলতা বসল না| বলল, “আমার ক্ষিদে নেই-*'মাথা ধরেছে-".
প্লীজ ।,
টেনে বসালাম পাশের চেয়ারে । মড়ার মত ফ্যাকাশে মুখ--.
কন্তরীর মুখ ''মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল অসম্ভব.*"পরক্ষণেই ভাবলাম
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি না তো! !
আধখানা ওমলেটও শেষ করতে পারল ন। কম্তরী। লক্ষ্য
করলাম, খেতে খেতে বেশ কয়েকবার ব্বপ্লালু হয়ে উঠেছে ওর ছুই
চোখ...চার বছর আগে স্বপ্নবিভোর এ দৃষ্টি কতবার কতদিন দেখেছি
আমি । পর পর তিনটে হুইস্কি শেষ করে ফেললাম আমি । তখনো
মুখ নীচ করে আত্মবিভোর হয়ে রইল কন্তরী |
চতুর্থ পেগট। ঠোটের কাছে তুলে বললাম, “দেখতে পাচ্ছি, শেষ
হতে চলেছে তোমার অন্তদ্বন্্---কন্তুরী, এবার কথ বলো ।'
জ্যা-মুক্ত ধন্থুকের মত তক্ষুনি উঠে দীড়াল কন্তরী |
“আসছি আমি” বলে চুমুক দিলাম গেলাসে | এক নিশ্বাসে
সবটা শেষ করে দিয়ে সিঁড়ির গোড়াতেই ধরে ফেললাম ওকে ।
সিঁড়ির ধাপে পা পিয়ে বাঁহাত দিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে, ঘাড় কাৎ
করে ফিসফিস করে বললাম কানের কাছে, '্বীকার করে৷ কস্তরী,
স্বীকার করে!
রেলিংয়ের ওপরে বসানে! ব্রোঞ্জের কিউপিড মুতিটার ওপর,
মাথা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুলতা | বলল, 'হ্যা, আমিই কন্তরী !'
১৯৩৭
প্রেত-প্রেরনী--৯
॥ হয় ॥
যন্তরটালিতের মত চাবি ঘুরিয়ে খুলে ফেললাম দরজ।। এই সেই
ন্বীকারোক্তি, যার প্রতীক্ষায় দীর্ঘ চার বছর কি অপরিসীম কষ্টই না
ভোগ করতে হয়েছে আমাকে । কিন্তু কই, রহস্তের জট সরল হওয়া
দূরে থাকুক, এ যে আরও জটিল হয়ে উঠল। এ কি সত্যিই
স্বীকারোক্তি? এমন সহজতাবে বলল কন্তুরী! হয়তো। আমাকে
খুশি করার জন্যই বানিয়ে বলেছে_ শাস্তিতে থাকার শেষ প্রচেষ্টা ।
দরজার পাল্লায় হেলান দিয়ে শুধোলাম, প্রমাণ ?
“চাই নাকি ?
“না.*'কিস্ত---
ঘাবড়ে গেলাম আমি | হাঁয় ভগবান! তয় কি আমার স্সায়ু-
মগ্ডলীতে মৌরসী পাটা গেড়েছে! এত দুর্বল কেন আমি !
“'আলোটা নিভিয়ে দাও! মিনতি করে বলে কন্তরী।
খড়খড়ির ফাক দিয়ে আলে এসে পড়ল ঘরের দেয়ালে,
সিলিংয়ে। রাস্তার ল্যাম্পের আলো । ফাক ফাক আলে। আর
অন্ধকারের গরাদ। গরাদ! তাই বটে ! খাঁচায় বন্দী-__ছুজনেই !
খাটের ওপর এলিয়ে পড়ি আমি ।
“একথা আগে বলো নি কেন? কিসের তয় ?
দেখতে পাচ্ছিলাম ন। কস্ত্ররীকে--অন্ধকারের মধ্যে শুনল।ম
বাথরুমের মধ্যে ওর নডাচড়ার শব |
“উত্তর দাও, কার ভয়ে মুখবন্ধ করেছিলে এতদিন ?
নিরুত্তর রইল কন্তরী।
“সেদিন হ্বোটেলে আমাকে দেখেই তুমি চিনতে পেরেছিলে, তাই
নয়?
১৩৮
যা ॥
তক্ষুনি সব স্বীকার করলেই গোল চুকে যেত, এত ছলনার কি
দরকার ছিল! এ-রকম আহাম্মুকি করলে কেন?
প্রবল ঘুষিতে ক্যাঁচক্যাচ করে উঠল খাটের স্প্রিং
“কি বোক11-.এ বয়সে এরকম উজবুকি শোতা! পায় ?."তার
ওপর ওই চিঠিটা !...সোজা সুজি ন! বলে চিঠি লেখার প্রয়োজন হল
কেন
পাশে এসে বসল কস্তরী |
“তোমাকে কোনদিনই একথ। জানতে দিতে চাই নি আমি ।?
“কিন্ত আমি তো আগাগোড়াই জানতাম যে ';
“শোনো "খুলে বলতে দাও আমাকে "বলতে কষ্ট হচ্ছে-*'তবুও
বলতে দাও।”
হত যেন পুড়ে যাচ্ছে কস্তরীর! আড়ষ্ট হয়ে রইলাম আমি ।
দেহের সমস্ত মাংসপেশীগুলো৷ শক্ত হয়ে উঠেছে । এবার শুনবো
সেই ভয়াবহ তথ্য---যে গুঢ় রহন্তের জন্যে " কিন্ত ভয়ে শিউরে উঠছি
কেন আমি ?
“কলকাতায় যে মেয়েটিকে তুমি চিনতে, নিউএম্পায়াৰে
তোমার বন্ধু মহেন্দ্রের সঙ্গে যাকে দেখেছিলে, যার পিছু নিয়েছিলে
তুমি দিনের পর দিন, যাকে তুমি টেনে তুলেছিলে জলের মধ্যে
থেকে-_সে মরে নি" কোনদিনই মরে নি। বুঝেছে? আমি
কোনদিনই মরি নি।
হাসি পেল আমার । বললাম, “না, তুমি মরে। নি'*-শুধু যা
রাতারাতি সুলতা মিত্র হয়ে গেলে ।
“না গে। না--'তাহলে ভ।লই হতো! কিন্তু আমি সুলত। মিত্র
হই নি, চিরকালই ছিলাম। আমার আসল নাম, স্থুলতা মিত্র ।
আর এই সুলতা মিত্রকেই আগাগোড়া ভালবেসে এসেছে। তুমি ।'
“কি বলতে চাও তুমি ?
১৩৯
কন্তুরী কৌশিককে তুমি কোনদিনই দেখো নি। আমিই তার
ভূমিকায় অতিনয় করেছি। আমি ছিলাম মহেন্দ্র কৌশিকের
বুর্মের সঙ্গিনী"-ওগো, যদি পারো ক্ষমা কোরো! জানো, এ-জন্যে
কি কষ্ট পেতে হচ্ছে আমাকে?
সজোরে কস্তুরীর কক্জি চেপে ধরলাম আমি ।
'বুরুজের নিচে যে দেহ আছড়ে পড়েছিল, তুমি বলতে চাও
তা":
হ্যা, কন্তুরী কৌশিকের। একটু আগেই স্বামীর হাতে খুন
হয়েছিল সে." মরেছে শুধু কস্তরী কৌশিকই-"'বেঁচে রয়েছি আমি
**বুঝেছো ।
“মিথ্যে কথা, বিশ্বাস করি না আমি । বলাটা খুবই সহজ,
বিশেষ করে মহেন্দ্র আর বেঁচে নেই যে এসে তোমার এই গালগল্পের
সতাতা যাচাই করবে । তুমি তাহলে মহেন্দ্র রক্ষিতা ছিলে,
কেমন ? বেচারার বউকে মারার জন্তে গোটা প্লটটা তোমার মাথা
থেকেই বেরিয়েছিল? কিন্তু কেন?
“ওর টাকা ছিল বলে. আমরা বিলেত যাওয়ার প্ল্যান
করেছিলাম |
“চমতকার ! তাই যদি হয়, তবে বউকে নজরে রাখার জন্তে
মহেন্দ্র আমাকে সাধাসাধি করেছিল কেন ?
“উত্তেজিত হয়ো না |?
“আমি হই নিঃজীবনে এত শান্ততাবে কথা বলি নি আমি ।
বলো কেন?
“সন্দেহকে বিপথে চালিয়ে দেওয়ার জন্যে ; আত্মহত্যা করার
কোন যুক্তিযুক্ত কারণই ছিল না মহেন্দ্র কৌশিকের স্ত্রীর । কাজেই
এমন একজনকে খুঁজছিলেন ভদ্রলোক, যে কিনা সময় হলেই এগিয়ে
এসে বলতে পারবে, হ্যা, উদ্ভট ভাবনা-চিন্তা গজগজ করতো কন্তরী
কৌশিকের মাথায়, মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতো সে পূর্বজন্মের
১৪৩
সবকিছুই তার নখদর্পণে, মৃত্যু তার কাছে খুব একটা বড় ব্যাপার
নয়__খেলার মতই; এমন এক জনকেই দরকার ছিল, যে বলতে
পারবে, হ্যা, আমি দেখেছি, কন্তরী কৌশিককে এর আগে আর
একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করতে-.'তুমি উকিল মান্ুষ'*'তাছাঁড়া”"'
তোমার নাড়ীনক্ষত্র তার জানা...গোট? গল্পটাই যে তুমি অক্ষবে
অক্ষরে বিশ্বাস করবে, তা জানতেন তিনি
“বটে! আমার মতই একটা নিরেট গর্দভকে খুঁজছিল সে !
শুধু নিরেট কেন, জু আলগা থাকাও দরকাঁর ছিল, কেমন? কি
নির্খুত প্ল্যান! তাহলে থিয়েটারে যাকে দেখেছিলাম, সে তুমি;
উমা দেবীর সমাধির সামনে যে গিয়েছিল, সে-ও তুমি ; মহেন্দ্র
ঘবে যার ফটোশ্রাফ দেখেছিলাম, তা-ও তোমার ?
ন্া।
“এরপর নিশ্চয় বলবে,উম। দেবী বলে কম্মিন্কালে কেউ ছিল ন1 ?
“ছিল |”
£৪! অর্থাৎ এটুকু আর উড়িয়ে দেওয়া গেল না।'
'ল্লীজ, একটু বোঝবার চেষ্টা করো 1” দীর্ঘশ্বাস শুনলাম |
“বেশ বুঝছি আমি, জলেব মত বুঝছি। এও বুঝছি যে
এমন খাঁসা একটা গল্পকে কীচিয়ে দিচ্ছে এক! উমা দেবীই |
'গল্প হলে তো বীচতাম,' বিড়বিড় করে বলে কস্তুরী, উমা দেবী
সত্যি সত্যিই কস্তুরী কৌশিকেরই পূর্বপুরুষ । সত্যি কথা৷ বলতে
কি, উমা দেবীর কাহিনী শুনেই মতলবটা। তোমার বন্ধুর মাথায়
এসেছিল। পূর্বপুরুষের আত্মার ভর হওয়া, সমাধিস্থানে বার বার
যাওয়া, উম! দেবীও তো৷ জলে ডুবে আত্মহতা! কবেছিলেন--তাই
আত্মহত্যার অভিনয় ""*
“অভিনয় ?
“তাছাড়া আর কি? জল থেকে তুমি আমাকে না হুললেও
আমি ডুবতাম না। ফাতারে আমি বরাবরই ভালো! |
১৪১
হাত নিশপিশ করে উঠল আমার-_পাশে কিছু একটা করে
ফেলি সেই ভয়ে তাড়াতাড়ি খামচে ধরলাম বিছানায় চাদর |
কিস্তু রোষ চাপ। রইল না কে £ “সাবাস মহেন্দ্র, খুব ঘুঘুর খেল
দেখালে ! কিছুই ভাবতে বাকি রাঁখো নি! আচ্ছা, তোমার সঙ্গে
আলাপ করার জন্যে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করার সময়ে মহেন্দ্র নিশ্চয়
জানত যে আমি যাবে। না ?”
“ঠিক তাই। তুমি যেতে চাইলে না। পরে আমিও তোমাকে
বাড়িতে ফোন করতে বারণ করে দিলাম | ্
তা! মন্দ নয়-'-চমৎকার-..কিস্ত ওই বুরজ? আমরা যে ওই
বুরজে যাবো, তা ও জানলে। কি করে? বুঝেছি-*'ড্রাইভ করেছিলে
তুমি, শ্যামনগরের নির্জন নীলকুঠি আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছিল,
ঠিক কখন গিয়ে পৌছবে, তাও নিখুঁতভাবে হিসেব করেছিলে,"
মহেন্দ্র শুধু নিজের বৌকে ঠিক তোমার মতই সাজিয়ে আগে থেকেই
হাজির ছিল বুরুজের চুড়োয় 'সমস্তই মিলে যাচ্ছে 'তবুণ্ড আমি
বিশ্বাস করি না." একটা কথাও বিশ্বাস করি না তোমার 'মহেন্্
খুনী নয় '-কখনই নয় *
"তিনিই খুনী। খুন না করে উপায়ও ছিল না। বিয়েকরে
সখী হন নি ভদ্রলোক | কন্তুরী সত্যি সত্যিই রুগ্র ছিল "বুঝতেই
পারছে! রোগটা কিসের" ..অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন তোমার বন্ধু,
ফল হয়নি কিছুই...কারোর বিধানই সঠিক হয় নি-.-অতিষ্ঠ হয়ে
উঠেছিলেন মহেন্দ্রবাবু-*-
“এবার সব পরিষার হয়ে আসছে | বুরুজ নিয়ে আর কোন
সমস্যা নেই। আগে থেকেই চুড়োয় উঠে বসেছিল মহেন্দ্র, বউকে
খুন করে মুখখানা-এমন বিকৃত করে রেখেছিল যাতে কেউই চিনতে
না৷ পারে_-তারপ্রেই গাড়ি হাঁকিয়ে পৌছে গেলে তুমি ॥ মহেন্দ্র
জানতে। আমার ব্যায়রাম, উঁচুতে উঠতে পারি ন""-দরজাট! সেই
কারণেই পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল ন। আমার পক্ষে" "আমাকে
১৪২
কেটে ফেললেও আলসে দিয়ে যেতে পারতাম না'*'ইতিমধ্যে তুমি
উঠে গেলে ওপরে "ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে মরা বউকে বাইরে ঠেলে ফেলে
দিলে মহেন্দ্র, তুমিও বুকফাটা! গলায় টেচিয়ে উঠলে | তারপর ?
তারপর তোমরা ঝুঁকে দেখতে লাগলে কিভাবে টলতে টলতে আমি
এগিয়ে গেলাম লাসটার দিকে ' হুবহু তোঁমার মতই শাডি-বাউজ
পরে এসেছিলেন ভদ্রমহিলা, চুলও বেঁধেছিলেন একই ঢডে।-*"
দেখছো, তুমি বলবার আগেই সব খলে দিচ্ছি আমি! আমাকে
আচ্ছনের মত চলে যেতে দেখে তোমরা "
হাপাচ্ছিলাম আমি। জ্কুর মত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কাহিনীট!
সেঁধিয়ে যাচ্ছে মগজের মধ্যে '*মজত্স খুটিনাটি গুলোও খাঁজে খাঁজে
বসে গিয়ে ধাপে ধাপে ক্লাইমাক্সের দিকে নিয়ে চলেছে ভয়ঙ্কর
বিয়োগান্তক নাটকটিকে।
অমর উচিত ছিল চেঁচামেচি করে লোকজন জড়ো করে
পুলিস ডাকা । মহ্ধেন্ত্রণ তাই হিসেব করে রেখেছিল-_পুলিসের
কাছে আত্মহত্যার একটা জমকালে। বিবরণ দেব। এই আশাই সে
করেছিল আমাব কাছে। গ্রামে লোকজন ডাকতে যাওয়ার সময়ে
তোমর। নেমে এসে মরে পড়তে-_কেমন তাই নয়? খাসা মতলব !
কিন্ত সব ভগ্জল করে দিলাম আমি । চেঁচামেচির ধার দিয়েও
গেলাম না। নিজে জ্বলে পুড়ে মরছি শারীরিক ছুর্লত৷ নিয়ে,
একটু আগে একটা মেয়েকেও মরবার সুযোগ করে দিয়েছি- সেই
ভুবলতাকে ঢাক পিটিয়ে ছনিয়ার সামনে জাহিব করতে চাই নি
জামি। ফেঁসে গেল নহেক্দ্রর পরিকল্পনা । ও কল্পনাই করতে
পারে নি একদম বোবা হয়ে যাবো আমি--যে লোক এর আগেও
একবার নিজের জায়গায় আর একজনকে মরতে দিয়েছে, তার পক্ষে
এই আত্মযন্ত্রণা আব নীরবতা হয়তো অস্বাভাবিক নয় | কিন্তৃ--",
না, কোনে ভুলই হয় নি আমার, ওই একটি জায়গাতেই কেঁচে
গেল অমন চমৎকার প্ল্যানটা। মনে পড়লে! সেই ভয়াবহ রাতে
১৪৩
মহেন্দ্রর প্রাসাদে গিয়ে কি পরিমাণ আতঙ্ক দেখেছিলাম বন্ধুর চোখে
মুখে, কিছু বলতে পারে নি সে, বলার উপায়ও ছিল না। পরের
দিন সকালে ফোন করেছিল মহেন্দ্র, যা ভয় করেছিলাম, কন্তরী
আত্মহত্যা করেছে...পুলিশ তদন্ত শুরু করে দিয়েছে..'যাই হোঁক,
আমার সঙ্গে তুমি থাকলে স্বস্তি পেতাম*"
মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করেছিল মহেন্দ্র যাতে নাটকের শেষ
ংশটুকু আবার আমি অতিনয় করি । ঠিক। আমার নীরবতাই
বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে ছকটার। তারপরেই পুলিস মহেন্দ্রকে
নিয়ে পড়েছে । কেননা, আত্মহত্যার কোনো কারণ ছিল ন!
মিসেস কৌশিকের, অগাধ সম্পত্তির মালিক ছিলেন তিনি, তার
মৃতাতে সব টাকাই পাচ্ছে মহেন্দ্র, কাজেই পুলিসের সন্দেহ হওয়া!
স্বাভাবিক. তার ওপর গায়ের লোকেরা সন্ত্রীক মহেন্দ্রকে গাড়ি করে
যেতেও দেখেছে সত্যিই,খুব বেকায়দায় পড়েছিল বেচাবি। তারপরেই
সত্রী-হত্যাব প্রায়শ্চিত কবে গেল মোটর আআকসিডেন্টে নিজে
মরে" 1
বালিশে মাথা গুজে নিঃশব্দে কাদছিল শ্লতা । আচম্থিতে
উপলব্ধি করলাম, সব যন্ত্রণার অস্তে পৌছেছি আমি । শেষ, শেষ,
সব শেষ। দৃদচাখ খুলে এতদিন আমি ছুঃ্বপ্রের ঘোরে দিন যাপন
করেছি-*শষ্যাসঙ্গিনী এই স্ত্রীলোকটিই তাহলে সুলতা" "মহেন্দ্র
সঙ্গেও বোধকবি এই বাড়িতে রাত কাটিয়েছে সে, তখনই ঘনিষ্ঠ হয়ে
উঠেছিল ছুজনে-.'ছুবল মুহুর্তে মত দিয়েছে মহেন্দ্র মতলবে, রাজি
হয়েছে ছকমাফিক নাটকেব অভিনয়ে, দীর্ঘ চার বছর পরে আবার
আর এক দূর্বল মুহূর্তে এই অভিশপ্ত গৃহেই স্বীকার করলো৷ সে সব
কিছু, উজার করে ঢেলে দিল সঞ্চিত ছুঃখ, পাপ আর অন্ঠায়বোধের
ভূপ ' এক হতভাগ্য নির্বোধ অনুস্থ উকিলকে ফার্দে ফেলার করুণ
কাহিনী, তাকে সঙ সাজানোর হাস্তকর কাহিনী.''না'*'না ''আমি
বিশ্বাস করি না'''এক বর্ণও বিশ্বাস করি না-**কখনই করি না."
১৪৪
সমস্ত মিথ্যে "আমার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্তে আগাগোড়া
বানিয়ে বলেছে মায়াবিনী কুছকিনী...আমাকে ভালোবাসে না
সুলতা. 'কন্তবরী-.কোনদিনই বাসে নি'''চার বছর আগেও না."
পরেও না,
কস্তরী / তীব্র চাপ! স্বরে হিসহিসিয়ে উঠেছিলাম |
চোখ মুছে মাথ। তুলে মুখের ওপর থেকে পেছনে চুলগুলো
সরিয়ে দিয়ে জবাব দিলে ও, আমি কস্তভরী নই |,
পর মুহ্র্তেই ঈ্াতে দাঁত পিষে শক্ত মুঠিতে টিপে ধরলাম কম্তরীর
গলা।
যেন একটা পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহ নিঃসীম আক্রোশে গজরে
উঠেছিল আমার কে | ভয়াল দামামা বেজে উঠেছিল মস্তিক্ষের
কোষে কোষে, লক্ষ লক্ষ অগ্রিশিখ। নৃত্য করে উঠেছিল প্রতিটি রক্ত
কণিকায়।
“মিথ্যেবাদী-"-আগাগোড়া মিথো বলে আসছে তুমি'*-কিস্ত
দেখতে পাচ্ছে। না, বুঝতে পারছে। না, আমি তোমায় ভালবাসি ।
চিরকাল বেসেছি-__উম। দেবী, সমাধি আর তোমার ওই স্বপ্নছাওয়।
পাগল করা চোখের জন্যে সেই প্রথম দিনটি থেকে তোমাকে আমি
সমস্ত অন্তর দিয়ে তাঁলবেসে এসেছি ' একটা সুন্দর ফুলকে, তার
সৌরতকে মানুষ যেমন নি:ম্বার্থভাবে ভালবাসে, আমার এই
ভালবাসাও তেমনি..'নিখাদ'*.নির্লোত.''যেদিন থেকে তোমাকে
দেখেছি, তোমাকে স্পর্শ করেছি, সেই দিন থেকেই জেনেছি, তুমিই
আমার জীবনের একমাত্র নারী--.আর কেউ নেই.*"ছিল না-**
থাকবে না...কস্তরী *'মনে পড়ে মিউজিয়ামে যাওয়া ? বিটি. রোড
বরাবর গাড়ি চালানে। ?.""ছুধসাগরের পাড়ে...ফুল * গঙ্গার তীর..*
স্বপ্নে দেখ! সেই গ্রাম-""কস্তরী | দোহাই তোমার, “সতা বলে 1
নিথর হয়ে রইল কম্তরী। অসীগ যন্ত্রণায় গল! থেকে আঙ্ল
সরিয়ে নিয়ে কাপতে কাপতে গিয়ে আলে। জেলে দিলাম।
১৪৫
পরক্ষণেই আমার বিকট আর্ভ-চীৎকারে হোটেলের সব ক'টা,
ঘর খালি করে লোকজন ছুটে এলো দরজার সামনে ।
অনেক আগেই কান্না বন্ধ হয়ে গেছেল আমার একদৃষ্টে
তাকিয়েছিলাম শয্যার পানে। হাতকড়ি না থাকলেও বুকের ওপর
হ্বহাত ভাজ করে রাখতাম আমি। পুরীতে বন্ধুর কাছে লেখ!
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর মল্লিকের চিঠিখানা সবে পড়া শেষ
করে উঠে দীড়ালেন পুলিস ইন্সপেক্টর |
চলুন |
লোক গিজ-গিজ করছিল ঘরের তেতরে-_কারোর মুখে
এতটুকু শব নেই।
বিড়বিড় করে বলেছিলাম, 'কম্তরীর কাছে একবার যেতে
পারি?
নিঃশব্দে ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি দিলেন ইন্সপেক্টর । মেপে
মেপে পা ফেলে খাটের পাশে গিয়ে দাড়ালাম আমি । নিশ্রাণ তন্বী
দেহে আশ্র্য স্বাচ্ছন্দ্য, মুখে অপরিসীম প্রশাস্তি। ভয় হল; পাছে
ওর ঘুম তেঙে যায়। তাই আলতো! করে অধরের ছোয়া দিলাম":
আইভরির মত শুভ্র ললাটে |
বললাম গাট স্গিপ্ধ কণ্ঠে, আবার দেখ। হবে।
॥শেষ।॥
১৪৬